বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, কমছে না হাম ও এর উপসর্গের সংক্রমণও। সেই সঙ্গে বাড়ছে এই দুই রোগে মৃত্যুর মিছিল। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে একজন ও রোগটির উপসর্গে সারা দেশে মারা গেছে আরও দুজন শিশু। নতুন করে রোগটি শনাক্তসহ আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৭৫ জন। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে গত ১৩৫ দিনে হাম ও ভাইরাসজনিত রোগটির উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩১ জনে, যা অন্তত তিন দশকের ইতিহাসে বিরল। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ছিল ৯৬ জন আর সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে বাকি ৭৩৫ জন। ২৬ জুন হাম ও হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু ৭০০ এবং এর ২৬ দিনের মাথায় ২২ জুলাই মৃত্যু ৮০০ ছাড়ায়। এছাড়া সাড়ে চারমাসে রোগটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ২৭৯ জনে।
অন্যদিকে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনজন আর ৫৩৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরে দৈনিক হিসেবে সর্বোচ্চ। এ নিয়ে চলতি বছর রোগটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৯০ জনে, যার অর্ধেকেরও বেশি আট হাজার ৫৮৬ জনই আক্রান্ত হয়েছে চলতি মাসে। আর এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৫০ জন, যাদের ৩২ জনেরই মৃত্যু হয়েছে চলতি মাসের ২৮ দিনে, যা মাসওয়ারি সর্বোচ্চ। এর আগে গত জুন মাসে প্রাণ গেছে ১৩ জনের।
হাম ও উপসর্গে মৃত্যু বাড়ছেই: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত হামে মৃত শিশুটি ঢাকা বিভাগের আর উপসর্গে মৃত দুজন শিশু চট্টগ্রাম বিভাগে মারা গেছে। জেলা হিসেবে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি দুজন মারা গেছে। এ সময়ে রোগটির উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো ৯৯৬ জন শিশু, যাদের ৮৯৫ জনই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
অন্যদিকে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৭৯ জন শিশুর শরীরে। এ নিয়ে চলতি বছরে রোগটির উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৬ হাজার ৫৪০ জনে আর ১৫ হাজার ৭৩৯ জন শিশুর শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৯৬৩ জন শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে। সারাদেশে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক ও হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল এক লাখ ৯ হাজার ৩৩৬ জন, যাদের এক লাখ ৫ হাজার ১৯৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে হামের প্রকোপ শুরু হয়। পরে ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর তথ্য দিয়ে আসছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ও আক্রান্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে ৩৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও আক্রান্ত হয়েছে ৬৬ হাজার ৫৩৭ জন শিশু। সর্বোচ্চ মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিলেট বিভাগে এখন পর্যন্ত ১১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাছাড়া এই সময়ে রাজশাহী বিভাগে ৯৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৭১ জন, বরিশাল বিভাগে ৬৩ জন, খুলনা বিভাগে ৩২ জন ও রংপুর বিভাগে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে হামে আক্রান্ত হয়ে এত মৃত্যুর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে গত মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম কিংবা হামের উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে। এ সময়ে এত রোগী আর কোনো দেশে পাওয়া যায়নি। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। গত বছর মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে দুই হাজার ৪১০ জন, ২০৩ জন, ৩১১ জন, ২৮১ জন ও ২৪৭ জন। এ সময়ে মৃত্যুর ঘটনা ছিলই না।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত বুলেটিনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে গতকাল বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত মৃত তিনজনের দুজন নারী ও একজন পুরুষ। তাদের মধ্যে একজন করে ঢাকা বিভাগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এ বছর মারা যাওয়া ৫০ জনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি এলাকায় সর্বোচ্চ ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এরপর ঢাকা উত্তর সিটি এবং খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে ছয়জন করে, চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচজন, রাজশাহী বিভাগে তিনজন এবং রংপুর ও সিটি করপোরেশন বাদে ঢাকা বিভাগে একজন করে মারা গেছেন রোগটিতে।
অন্যদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৩৪ জনের মধ্যে ৩৩৮ জন বা ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ ও ১৯৬ জন বা ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। তাদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ৬৫ জন ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে ৫৬ জন ভর্তি হয়েছেন । ঢাকা বিভাগে দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে আরো ১৩১ জন ভর্তি হয়েছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। এছাড়া চট্টগ্রামে ৭১ জন, বরিশালে ৬৮ জন, খুলনা বিভাগে ৪৫ জন, ময়মনসিংহে ৩৭ জন, রাজশাহীতে ৩০ জন, রংপুরে ২৬ জন এবং সিলেটে পাঁচজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এদিকে ২৪ ঘণ্টায় ৪৪৩ জনসহ এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৩ হাজার ৪৫২ জন। ৫০ জনের মৃত্যুর পর এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক হাজার ১৮৮ জন। মশাবাহিত এই রোগটিতে চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আক্রান্ত ১৪ হাজার ৬৯০ জন রোগীর মধ্যে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। এই বছর মারা যাওয়া ৫০ জনের মধ্যে ৪০ শতাংশ পুরুষ ও ৬০ শতাংশ নারী।
সারা দেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য রাখে ২০০০ সাল থেকে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে এ রোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুও হয় ওই বছর। গত বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় চার শতাধিক মানুষের, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল এক লাখ দুই হাজারের মতো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









