পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার রনগোপালদী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রটি এখন অবহেলা, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, তীব্র জনবল সংকট ও ওষুধের অভাবের এক করুণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৮ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা ভবনের মাত্র দুটি কক্ষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। চিকিৎসক, নার্স কিংবা সহায়ক কর্মচারী না থাকায় পুরো কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, দরজা-জানালা ভাঙাচোরা, অধিকাংশ কক্ষ অন্ধকার ও ব্যবহার অনুপযোগী। চারপাশজুড়ে আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ভরে যাওয়ায় সাপসহ বিভিন্ন বিষাক্ত প্রাণীর উপদ্রবের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর ভবনটির আশপাশে যেতেও অনেকেই ভয় পান।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “রোগী নিয়ে এখানে এলে হাসপাতালের চেয়ে পরিত্যক্ত বাড়ি বলেই মনে হয়। চিকিৎসক নেই, পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, ভেতরে আলো নেই, চারপাশে আগাছা। সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আর সাপের ভয় নিয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য নির্মল হাওলাদার বলেন, “পরিত্যক্ত ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই চলছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এর সঙ্গে রয়েছে তীব্র ওষুধ সংকট ও জনবল সংকট। একজন কর্মীর ওপর পুরো কেন্দ্র নির্ভর করায় রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। অনেকেই ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।”
কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা লাইজু আক্তার বলেন, “একজন মানুষের পক্ষে রোগী দেখা, ওষুধ বিতরণ, টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা, গর্ভবতী মায়েদের পরামর্শ দেওয়া, রেজিস্টার সংরক্ষণ এবং সরকারি প্রতিবেদন প্রস্তুত—সব দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা অত্যন্ত কঠিন। তারপরও এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পরিত্যক্ত ভবনেই সেবা দিয়ে যাচ্ছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভবনটির কোনো সংস্কার হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা কাঙ্ক্ষিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দশমিনা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফারজানা লিসা বলেন, “রনগোপালদী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রটি ২০১৮ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ২০১০ সালের পর কোনো জনবল নিয়োগ না হওয়ায় চরম সংকট তৈরি হয়েছে। তাই নিরুপায় হয়ে একজন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিদর্শিকাকে দিয়ে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”
তিনি আরো বলেন, “গত দুই অর্থবছর ধরে ওষুধ সরবরাহ প্রায় নেই বললেই চলে। যে সামান্য পরিমাণ ওষুধ পাওয়া যায়, তা দিয়েই কোনো রকম স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, জরাজীর্ণ ভবনের পরিবর্তে দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে ইউনিয়নের হাজারো মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে আরও বঞ্চিত হবেন। একটি নিরাপদ ও কার্যকর স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন রনগোপালদীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









