২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ার ১৬ জন শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৬ শতাধিক মানুষ। ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে মাধ্যমে ছাত্র-জনতার বিজয় অর্জনের পরপরই কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের গুলিতে ৮টি তাজা প্রাণ ঝরে যায়। আহত হন আরও ছয় শতাধিক ছাত্র-জনতা। বিপ্লবে জয়ী হওয়ার পর যখন কুষ্টিয়ার মানুষের আনন্দ ও উল্লাসে মেতে থাকার কথা ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সকল আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়ে পুরো জেলাবাসী শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। হাসপাতালে নিহত ও আহতদের স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস যেমন ভারী হয়ে পড়েছিল, তেমনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের বাঁচাতে প্রাণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হাজারো মানুষ।
এমন অভূতপূর্ব পরিবেশ আজও ভোলার নয়। জেলার একমাত্র জেনারেল হাসপাতালে নিহতদের লাশের স্তূপ পড়ে যায় এবং আহতদের সঠিক সংখ্যা গুনে রাখার মতো পরিস্থিতি ছিল না। ঢাকা, কুষ্টিয়া ও চট্টগ্রামে মোট কুষ্টিয়ার ১৬ জন সন্তান শহীদ হন।
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ২৪-এর ৫ আগস্টের ঘটনা কুষ্টিয়াবাসীর মনে আজও দাগ কেটে যায়। ঐ দিন কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন তুঙ্গে ছিল। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে শহরের চৌড়হাস, কাস্টমস মোড়, উপজেলা মোড়, সাদ্দাম বাজার, মজমপুর গেট, পাঁচ রাস্তার মোড় ও থানাপাড়া ৬ রাস্তার মোড় ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের জীবন বাজি রেখে সম্মুখ যুদ্ধ চলে।
৪ আগস্ট কুষ্টিয়ায় পুলিশের সাথে শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলনকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাঁধে। অনেকে আহত হলেও সেদিন কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি। শহরের থানাপাড়া ৬ রাস্তার মোড়, মজমপুর গেট, থানা মোড়, চৌড়হাস ও সাদ্দাম বাজার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। চারদিকে পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের শব্দে পুরো শহর কেঁপে ওঠে। এদিন সারাদিনই থানাপাড়া ৬ রাস্তার মোড় আন্দোলনকারীদের দখলে ছিল। মজমপুর গেট পুলিশের দখলে থাকলেও জিলা স্কুল, সাদ্দাম বাজার ও চৌড়হাস ছিল আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার দখলে। দিনশেষে সড়কে ইট-পাটকেল ও পাথরের স্তূপ দেখে বোঝা যাচ্ছিল সারাদিনের তাণ্ডবের তীব্রতা।
২৪-এর ৫ আগস্ট সকাল ৯টার আগেই মজমপুর গেট, ৫ রাস্তার মোড় ও ৬ রাস্তার মোড় দখলে নেয় দাঙ্গা পুলিশ। এতে আন্দোলনকারীরা ত্রিমুখী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। মজমপুর গেট থেকে সরাসরি পৌরসভার দিকে এবং সাদ্দাম বাজারের দিকে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। শহরের কয়েকটি পয়েন্ট পুলিশ নিজেদের দখলে নিলেও ঐসব পয়েন্টের চারপাশ ঘিরে রেখেছিল আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা।
দুপুর ১২টার দিকে সেনাবাহিনী জিলা স্কুল ক্যাম্পাস থেকে নেমে এসে ছাত্র-জনতার সাথে হাত মেলায় এবং সকলকে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কথা বলে পুলিশকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এ সময় মজমপুর গেটে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা জনতার উপর টিয়ারগ্যাস ও গুলি ছুড়তে ছুড়তে পুলিশ লাইন্সের দিকে চলে যায়। ফলে সড়কগুলোতে ছাত্র-জনতার সমাগম আরো বাড়তে থাকে।
এক পর্যায়ে দুপুর ২টায় হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবরে ছাত্র-জনতা কুষ্টিয়া মডেল থানার চারিপাশে অবস্থান নেয়। এ সময় থানা থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে পুলিশ নির্বিচারে গুলি করতে থাকে। পুলিশ গুলি চালাতে চালাতে মজমপুর গেট হয়ে পুলিশ লাইন্সে আশ্রয় নেয়। পুলিশের ছোড়া গুলিতে শত শত ছাত্র-জনতা আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সাথে সাথে আহত ও নিহতদের কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশের গুলিতে ৮টি তাজা প্রাণ নিভে যায় এবং আহত হন ৬ শতাধিক মানুষ।
৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় নিহতরা হলেন— কুষ্টিয়া শহরের চর থানাপাড়ার আব্দুল্লাহ আল মুসতাকিন, চর আমলাপাড়ার সবুজ, চর থানাপাড়ার ইউসুফ শেখ আলী, হাটশ হরিপুরের বাবলু ফারাজি, হরিপুর শালদহের আশরাফুল ইসলাম ও সুরুজ আলী বাবু, সদর উপজেলার দহকোলা গ্রামের হাফেজ উসামা এবং খোকসা চাঁদটের মাহিম হোসেন।
এছাড়া কুষ্টিয়ার সন্তান হিসেবে চট্টগ্রামে শহীদ হন কুমারখালী উপজেলার চর জগন্নাথপুর গ্রামের সেলিম মন্ডল ও আব্দুস সালাম। আর ঢাকায় আন্দোলনরত অবস্থায় শহীদ হন কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়ার জুবায়ের আহমেদ ও জামাল উদ্দিন শেখ, সুলতানপুরের আসহাবুল ইয়ামিন, শিলাইদহ কসবার আলমগীর হোসেন, খোকসা জানিপুরের মারুফ হোসেন এবং ভেড়ামারা উপজেলার কলেজপাড়ার মোঃ কবির।
জুলাই '২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি, কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি সুজন মাহমুদ জানান, জুলাই অভ্যুত্থান ২ বছর অতিক্রম করলেও মামলার কাঙ্ক্ষিত কোনো অগ্রগতি নেই। দোষীদের শাস্তি না হলে শহীদদের আত্মার শান্তি আসবে না।
তিনি বলেন, “আমি নিজে বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেছি। কিন্তু আদালত থেকে তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে পিবিআই ১২৬ জন আসামীর মধ্যে প্রকৃত দোষীদের নাম বাদ দিয়ে মনগড়া ১৩ জনকে আসামী করে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিয়েছে। সেই তদন্ত রিপোর্ট আমাদের আগে জানানোর কথা থাকলেও দেখানো হয়নি। পরবর্তীতে আদালত থেকে অনেক চেষ্টা করে তদন্তের কপি হাতে পেয়ে দেখলাম, যে পুলিশদের গুলিতে আমার পিতা শহীদ হলেন, তাদের নামই নেই। ফলে এই মামলায় আশানুরূপ রায় পাওয়া সম্ভব নয়।”
এ ব্যাপারে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তদন্ত রিপোর্ট এভাবে দেওয়া হয়েছে।
সুজন মাহমুদ আরো জানান, সরকারিভাবে জেলার ১৬টি শহীদ পরিবারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ৫ লাখ টাকা, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা, ‘আমরা বিএনপি পরিবার’র পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা, জেলা জামায়াতের উদ্যোগে প্রতি শহীদ পরিবারকে ২ লাখ টাকা এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমানে শহীদ পরিবারকে মাসিক ২০ হাজার টাকা, আহত ‘এ’ ক্যাটাগরিকে ২০ হাজার টাকা, ‘বি’ ক্যাটাগরিকে ১৫ হাজার টাকা এবং ‘সি’ ক্যাটাগরিকে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
হরিপুর শালদহ গ্রামের শহীদ আশরাফুলের স্ত্রী লাবনী আক্তার জানান, “দুই সন্তান নিয়ে সংসারের হাল ধরে আছি। মামলা করেছি, কিন্তু কোনো অগ্রগতি দেখছি না। একবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছি। জানি না কবে রায় হবে আর দোষীরা কবে শাস্তির মুখোমুখি হবে।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









