অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যা ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের রাউজানে আউশ ধান, আমন বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। বন্যায় রাউজানে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১১৫০ জন। উপজেলায় কৃষিখাতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ১৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
উপজেলা কৃষি অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিগত ৫ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত একটানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় তলিয়ে যায় উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ জনপদ। বন্যায় বুক ও কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ ফসলী জমি। টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় মাঠের ফসলী জমিতেই সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় শাকসবজি ও আউশ ধানের আবাদ।
এখনো বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে পানির জলাবদ্ধতা ও জমিতে পলি জমে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করতে সংকটে পড়েছেন উপজেলার সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। এছাড়া বন্যার পানিতে জমির ফসল নষ্ট হয়ে চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন অগুনিত কৃষক।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে উপ-সহকারী কৃষি অফিসারদের প্রস্তুতকৃত তথ্যে জানা গেছে, উপজেলার ১৪ ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে ২৮০ হেক্টর আউশ ধানের মধ্যে দুর্যোগ কবলিত হয় ১৪৩ হেক্টর জমি, তন্মধ্যে ৯৩ হেক্টর জমি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ১৮০ জন কৃষকের ৩০৮ মে.টন ফসল বিনষ্ট হয়। এইখাতে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
উপজেলার ২২৩ হেক্টর আমনের বীজতলার মধ্যে ১১২ হেক্টর বীজতলা দুর্যোগ কবলিত হয়। তন্মধ্যে ৯৪ হেক্টর আমানের বীজতলা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০ লাখ ৪ হাজার হাজার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৬০টি কৃষক পরিবার।
উপজেলায় ৪৩৫ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে দুর্যোগে পতিত হয় ১৭৩ হেক্টর জমি। এতে ১২৭ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১হাজার ৯৩ দশমিক ২ হেক্টর ফসল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় এই খাতে ৫১০ জন কৃষকের ২ কোটি ১৮ লাখ ৬৪ হাজার হাজার আর্থিক ক্ষতিসাধন হয়েছে।
বন্যায় উপজেলার মোট ১১৫০ জন কৃষকের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ১৬ লাখ ৮৮ হাজার টাকা।
এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পেঁপে, আদা, হলুদ, মরিচ, বেগুন, বরবটি, কলাসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসলও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিনে রাউজানের বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যার পানি কমলেও এখনো বিস্তীর্ণ কৃষি জমিতে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে আছে। কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সমস্যায় ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ফের নতুন করে চাষাবাদ করতে পারছেনা কৃষকরা।
উপজেলার ছিটিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক মো. শুক্কুর বলেন, কৃষি জমির উৎপাদিত ফসলে আমাদের সংসারের চাকা ঘুরতো। এখন বন্যার পানিতে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
ডাবুয়া এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, মাঠের ফসল মাঠেই বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে চাষাবাদ করবো সেই সামর্থ্যে আর নেই। একদিকে ঋণের চাপ, অপরদিকে আয়-রোজগার বন্ধ। সরকারি প্রণোদনা না পেলে কি পরিস্থিতি হবে ভাবতেই পারছিনা।
রাউজান উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মাসুম কবির বলেন, রাউজানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে যে সকল কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের জন্য প্রণোদনাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে আমরা প্রস্তাব জেলার মাধ্যমে মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করেছি। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাবস্থায় ভেঙে পড়ার পাশাপাশি জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয়ে মাঠ পর্যায়ে বেশ কষ্টসাধ্য ছিল।
মন্ত্রনালয় থেকেও সবকিছু সার্বিক মনিটরিং করা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
আশা করছি খুব শীঘ্রই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা প্রণোদনা পাবেন। এবং বীজ, সারসহ সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে তাদের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সব ধরণের সহযোগিতা আমাদের থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









