রাত যত গভীর হয়, ততই যেন বদলে যায় পাবনার কিছু অলিগলির চিত্র। অন্ধকারের আড়ালে নীরবে হাতবদল হয় বিভিন্ন ধরনের মাদক, আর সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। যে তরুণদের হাতে থাকার কথা ছিল বই, কলম কিংবা কর্মজীবনের স্বপ্ন, তাদের একটি অংশ আজ মাদকের ভয়াল ছোবলে বিপথে যাচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, পাবনায় ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি নতুন ধরনের কিছু মাদকও তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যেগুলোর অনেকটাই এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরের বাইরে। এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
মাদকাসক্তদের একটি অংশ নেশার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই, মাদক পাচার, এমনকি হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
এ পরিস্থিতিতে পাবনা জেলা পুলিশ নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে। জেলা পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, “আমি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এরপরও প্রতিদিনই মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকসেবী ও মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার, মাদক উদ্ধার এবং নিয়মিত মামলা দায়েরের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রতিটি পরিবারকে সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুমহল ও জীবনযাত্রার প্রতি আরও দায়িত্বশীল নজরদারি করতে হবে এবং নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শহরের বাসিন্দা হুমায়ুন রাশেদ বলেন, “আমরা নিজেরাই যথেষ্ট সচেতন নই। আমাদের সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে—সেদিকে নজর রাখি না। পরিবার থেকে নজরদারি বাড়লে অনেকেই নেশার মতো ভয়াবহ পথে জড়াত না।”
একজন অভিভাবক জানান, বিভিন্ন মোড়ে কিশোর-তরুণদের ধূমপান ও নেশায় আসক্ত হতে দেখা যায়। কিন্তু প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই নীরব থাকেন।
রাধানগর বটতলা এলাকার দোকানদার করিম মালিথা বলেন, “এখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আড্ডা দেয়। অনেকেই ধূমপান থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালেও মাদক সেবন ও বিক্রি পুরোপুরি কমছে না।”
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, মাদক প্রতিরোধে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ, মন্দির ও গির্জাসহ প্রতিটি সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
এদিকে ‘মশাল’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পাবনায় মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। স্থানীয়রা এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, অন্যান্য সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও একইভাবে এগিয়ে এলে মাদকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ। তাই মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়—পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









