হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর চাপ এখন সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে বর্তমানে ভর্তি ১১৪ জন রোগী। এর মধ্যে ৫৮ জন হাম আক্রান্ত। শয্যা সংকটে কোথাও এক বেডে দুজন, আবার কোথাও মেঝেতে রেখে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সিঁড়ির পাশেও অবস্থান নিতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
হামের মতো সংক্রামক রোগের আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালটিতে পর্যাপ্ত পৃথক আইসোলেশন সুবিধা না থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আক্রান্ত ও অনাক্রান্ত রোগীরা কাছাকাছি থাকায় হাসপাতাল থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন রোগী ও স্বজনেরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৮৩ জন চিকিৎসা নিতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ৫৫ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। পরীক্ষায় ৩২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ৪৭ জন বাড়ি ফিরেছেন।
রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাম আক্রান্তদের আলাদা রাখার জন্য কয়েকটি শয্যা নিয়ে সাময়িক ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে আক্রান্ত রোগীর তুলনায় এ ব্যবস্থা অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডসহ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর ভিড়। কয়েকটি শয্যায় দুজন করে রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা না পেয়ে কয়েকজনকে মেঝেতে অবস্থান করতে দেখা যায়। সিঁড়ির পাশে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্চেন রোগীরা ও তাঁদের স্বজনেরা। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
নিঝুমদ্বীপ থেকে আসা জুবায়ের হামে আক্রান্ত, শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন পপি বেগম। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। রোগী এত বেশি যে এক বেডে দুজন করে থাকতে হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধও সব সময় পাওয়া যায় না। ছোট শিশু নিয়ে খুবই দুর্ভোগে আছি।
পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের রূপনগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান অনু নিজেও হামে আক্রান্ত। তাঁর ছয় মাস বয়সী শিশুসন্তান আকিলও আক্রান্ত হয়েছে।
ইসরাত জাহান অনু বলেন, ‘আমি ও আমার ছয় মাসের সন্তান হামে আক্রান্ত। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিলাম। কিন্তু সিট পাইনি। হাসপাতালের পরিবেশও ভালো নয়। ছোট শিশুকে নিয়ে সেখানে থাকা সম্ভব না হওয়ায় বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। তাঁদের দাবি, দ্রুত পৃথক হাম ওয়ার্ড চালুর পাশাপাশি শয্যা, চিকিৎসক ও নার্স বাড়াতে হবে। পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নজর দিতে হবে।
হাতিয়া একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা। উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালটি প্রথমে ৩১ শয্যার ছিল। পরে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে শয্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল সেই অনুপাতে বাড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে রোগীর চাপ বাড়লেই সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা খালেক বলেন, ‘হাতিয়ায় মানুষ অসুস্থ হলে এই হাসপাতাল ছাড়া বড় কোনো বিকল্প নেই। এখন হাসপাতালেই যদি জায়গা না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় চিকিৎসা নেবে?
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্তদের দ্রুত পৃথক রাখা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুদের নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। আক্রান্ত ও অনাক্রান্ত রোগীদের একই পরিবেশে রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মানসী রানী সরকার বলেন, ‘পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আক্রান্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। অভিভাবকদের শিশুদের নির্ধারিত সব টিকা সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।’একই শয্যায় দুই রোগী থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হয়তো তারা একই পরিবারের সদস্য।
হামের প্রকোপ মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, হাতিয়ায় বিশেষ মেডিকেল টিম পাঠানোর পাশাপাশি হাম আক্রান্তদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড, অতিরিক্ত শয্যা ও পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









