সিলেট নগরের রায়নগর আবাসিক এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসায় দম্পতিসহ গৃহকর্মীকে নৃশংস খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত ছোরা উদ্ধার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার বাবুল মিয়ার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে রায়নগরের একটি খালি জায়গা থেকে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়। ছোরাটিতে রক্তের দাগ রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ছোরাটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। এতে থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে মিতালী ১১১ নম্বর বাসা থেকে বাড়ির মালিক মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনার (২৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর বিকেলে রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার একটি কলোনি থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পর ছোরাটি রায়নগরের একটি খালি জায়গায় ফেলে রাখা হয়। বুধবার সন্ধ্যায় সেখানে খোঁজ করেও সেটি পাওয়া যায়নি। পরে বৃহস্পতিবার শ্রমিক নিয়ে আবার তল্লাশি চালিয়ে ছোরাটি উদ্ধার করা হয়।
উপপুলিশ কমিশনার বলেন, “ঘটনাস্থলের বেসিন ও হাত ধোয়ার স্থানে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ছোরার ধাতব অংশেও শুকনো রক্তের দাগ রয়েছে। একটি ব্যাগেও রক্তের দাগ পাওয়া গেছে। এসব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হবে।”
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন, আগে ওই বাসায় রঙ করার কাজ করায় ঘরের ভেতরের পরিবেশ সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। রঙ করার কাজের সূত্রে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়। তবে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, তাহমিনার কোনো আচরণে বাবুল ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। সেই ক্ষোভ থেকে তিনি ছুরি নিয়ে ওই বাসায় যান বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথমে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাকে রক্ষা করতে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে বাবুলের ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এরপর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায় বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাস্থলে দরজার নিচের ছোট ছিটকানি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে। বাবুল যে বারান্দা দিয়ে পালানোর কথা বলেছেন, সেখানকার রেলিংয়ে হাত ও পায়ের ছাপ এবং নিচে রক্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে বাবুল ছাড়া অন্য কেউ ওই বাসায় প্রবেশ করেছিলেন, এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও জানান, বাসার কয়েকটি ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা থাকলেও সেগুলো ভাঙা ছিল না। কোনো মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজও পাওয়া গেছে। এটি মূল দলিল নয়, সম্ভবত ফটোকপি বা অনুলিপি। এর সঙ্গে সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মামলার এজাহার এখনো হয়নি জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নিহত দম্পতির প্রবাসী সন্তানেরা দেশে এসে এজাহার দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজাহার পাওয়ার পর মামলা রেকর্ড করে বাবুল মিয়াকে আজই আদালতে হাজির করা হবে।
পুলিশের ভাষ্য, উদ্ধার হওয়া ছোরা ও অন্যান্য আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার পাশাপাশি সাক্ষ্যপ্রমাণ যাচাইয়ের পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এলাকাবাসীর মানববন্ধন
এদিকে রায়নগরের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গ্রেপ্তার বাবুলের ফাঁসির দাবিতে নগরের চৌহাট্টা কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে মানববন্ধন করেছেন ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ূম চৌধুরীও অংশ নেন। তিনি আসামিদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, নিহত আবদুছ সাত্তার মিতালী আবাসিক এলাকার একজন প্রবীণ মুরব্বি ছিলেন। তাকে এভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো কেন, তা খুঁজে বের করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বাবুল ছাড়াও অন্য কারও ইন্ধন বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন








