উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন ময়মনসিংহ নগরীসহ গোটা জেলার বাসিন্দারা। দিন ও রাতে সমানতালে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার এই খেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে মারাত্মক বিপাকে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে বাসাবাড়ির ভোগান্তির পাশাপাশি এবার জেলার ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব খ্যাত ত্রিশাল ও ভালুকার শত শত শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
শুক্রবার (১৪ আগষ্ট) খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ময়মনসিংহ নগর এলাকায় গড়ে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। তবে জেলা সদরের বাইরে উপজেলা পর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে আরও আশঙ্কাজনকভাবে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতাধীন এলাকাগুলোতে দিনে-রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।
গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শহরের আকুয়া এলাকায় বিদ্যুৎ চলাচলের চিত্রটি ছিল সবচেয়ে করুণ। রাত ৮টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ৯টা ৩০ মিনিটে আসে, তবে রাত ১২টায় আবার চলে যায়। এরপর আড়াইটায় বিদ্যুৎ ফিরে এলেও ভোর সাড়ে ৪টা এবং সকাল সাড়ে ৬টায় পুনরায় লোডশেডিং হয়। আকুয়া এলাকার সাবেক সেনা সদস্য সার্জেন্ট এনামুল হক জানান, “সারারাত বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার কারণে আমরা একটুও ঘুমাতে পারিনি। প্রচণ্ড গরমে মানুষকে সীমাহীন কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।”
একই চিত্র বিরাজ করছে শহরের পাটগুদাম, সানকিপাড়া, স্টেশন রোড, কলেজ রোড ও চরপাড়া এলাকায়। চরপাড়ার বাসিন্দা বিলকিস আক্তার বলেন, “মাঝরাতেও ঘন ঘন লোডশেডিং চলছে। তীব্র গরমে অবর্ণনীয় কষ্টে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমরা দ্রুত এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই।”
ময়মনসিংহের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ভালুকা ও ত্রিশাল উপজেলা। এখানে টেক্সটাইল, পোশাক কারখানা, স্পিনিং মিল, সিরামিক, অটোমোবাইল ও বিভিন্ন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানা রয়েছে। তবে বর্তমানে অনিয়মিত ও অপ্রতুল বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ভালুকা শিল্পাঞ্চলের একাধিক পোশাক কারখানা ও টেক্সটাইল মিলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনে অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে গিয়ে ডিজেলের বিশাল খরচে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। অনেক সময় ভোল্টেজ ওঠা-নামা করায় দামি ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। ত্রিশালের মাঝারি ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো রফতানি ও স্থানীয় বাজারের অর্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না, যার ফলে বৈশ্বিক ও দেশীয় বাজারে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় ভুগছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। ভালুকার শিল্পকারখানার পাশাপাশি চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। মুক্তাগাছার কুমারগাতা এলাকার অটোরিকশা চালক ফারুক মিয়ার মতো ভালুকা ও ত্রিশালের হাজারও চালক জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় ইজিবাইক ও অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে না পেরে তাদের দৈনিক আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে।
সিটি কর্পোরেশন এলাকার চেয়ে প্রান্তিক উপজেলাগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ। ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, ২ ও ৩-এর আওতাধীন এলাকাগুলোতে তীব্র চাহিদা থাকলেও সরবরাহ মিলছে প্রয়োজনের মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও গফরগাঁও উপজেলায় দিনে-রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুতের মুখ দেখতে পাচ্ছেন গ্রাহকরা। ফুলবাড়িয়া উপজেলার সংবাদকর্মী সেলিম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “দিনে ১-২ ঘণ্টা লোডশেডিং মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু ১২-১৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ কীভাবে থাকবে? সরকারের উচিত যেকোনো মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো।” অন্যদিকে ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল ও ফুলপুর উপজেলার গ্রামীণ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং চলায় ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে ওঠার জোগাড় হয়েছে। পোলট্রি খামার, ডেইরি ফার্ম এবং চালকলগুলোতে বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাপক লোকসান গুণছেন মালিকরা। সীমান্তঘেঁষা হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় বিদ্যুতের আসার চেয়ে যাওয়ার সময়টাই বেশি। সন্ধ্যা হলেই পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে যায়, ফলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের বিষয়ে কথা বললে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র (দক্ষিণ)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মশিউল ইসলাম জানান, তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো সরবরাহ না পাওয়ায় এবং ঘাটতি মেটাতে বাধ্য হয়ে এই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ কেন্দ্র (উত্তর)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত রায়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের আওতাধীন অঞ্চলে শিল্পকারখানা ও বসতবাড়ির চাহিদা দ্বিগুণ হলেও জাতীয় গ্রিড থেকে ঘাটতি থাকছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। ফলে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্ন আলো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তীব্র তাপদাহ ও বিদ্যুতের সীমাহীন সংকট মিলে ময়মনসিংহের সাধারণ জনজীবন এখন পুরোদস্তুর তোলপাড়। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করে জেলার শিল্প খাত ও সাধারণ মানুষকে এই দুর্ভোগ থেকে বাঁচানোর জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









