বাংলা কবিতার অন্যতম কিংবদন্তি কবি শহীদ কাদরীর জন্মদিন বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট)। ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন। শহরকেন্দ্রিক জীবন, নাগরিক অভিজ্ঞতা ও আধুনিক কাব্যভাষার জন্য বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন এই কবি।
মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে পরিক্রমা শিরোনামে প্রথম কবিতা লেখেন শহীদ কাদরী। কবিতাটি প্রকাশিত হয় মহিউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত স্পন্দন পত্রিকায়। এরপর একই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার জলকন্যার জন্য কবিতা। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ কাব্যযাত্রা।
১৯৬৭ সালে ২৫ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় শহীদ কাদরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার। কৈশোর ও প্রথম যৌবনে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত এই গ্রন্থেই ফুটে ওঠে তার পরিণত কাব্যপ্রতিভা।
শহীদ কাদরীর কবিতায় নগরজীবনের পাশাপাশি প্রকৃতি ও ঋতুর উপস্থিতিও লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে শরৎ তার কবিতায় কখনো বিপ্লবী, কখনো মানবিক, আবার কখনো স্বপ্নচারী আবহ নিয়ে এসেছে।
নশ্বর জ্যোৎস্নায় কবিতায় শরতের আবহে তিনি নির্মাণ করেছেন এক অনাগত সময়ের চিত্র। জ্যোৎস্না, বাগানের ফুল, বাতাস, বকুলতলা ও জোনাকির আলোয় সেখানে তৈরি হয়েছে নাগরিক জীবনের এক বিষণ্ন সৌন্দর্য।
নাগরিক কবিতার অন্যতম প্রধান কবি
কলকাতায় জন্ম নেওয়া শহীদ কাদরীর শৈশবের একটি অংশ কেটেছে সেখানে। দেশভাগের পর তিনি চলে আসেন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায়। জীবনের পরবর্তী সময়ে বার্লিন, লন্ডন, বোস্টন হয়ে নিউইয়র্কে বসবাস করেন।
গ্রামীণ জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার চেয়ে শহুরে জীবনই ছিল তার কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। ফলে তার কাব্যভাষাও হয়ে ওঠে নাগরিক। নিজের কাব্যভাষা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, কাব্যভাষা তৈরির জন্য অভিজ্ঞতা লাগে, বই পড়ে নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি হয় না। এ কারণেই শহর, নাগরিক জীবন, মানুষের একাকিত্ব, প্রেম, রাজনীতি, দেশ ও প্রবাসের অভিজ্ঞতা তার কবিতায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
চার কাব্যগ্রন্থে ১২২ কবিতা
শহীদ কাদরীর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ চারটি— উত্তরাধিকার’, ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই এবং আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও।
এর মধ্যে প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো তিনি দেশ ছাড়ার আগে, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের মধ্যেই রচনা করেন। দীর্ঘ বিরতির পর নিউইয়র্কে অবস্থানকালে প্রবাসে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। এই চারটি কাব্যগ্রন্থে সংকলিত কবিতার সংখ্যা ১২২টি।
এর বাইরে তিনি আরও চারটি কবিতা লিখেছিলেন। এর মধ্যে তিনটি প্রকাশিত হয় কালি ও কলম-এ এবং অন্যটি প্রকাশিত হয় একটি ঈদসংখ্যায়। সব মিলিয়ে তার কবিতার সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৬টি।
আমার শূন্য হলো দিন
শহীদ কাদরীর কবিতায় শরৎ ও নাগরিক জীবনের যে মেলবন্ধন, তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ আমার শূন্য হলো দিন। কবিতায় শরতের প্রকৃতির সঙ্গে ব্যক্তিগত শূন্যতা ও বিষণ্নতাকে মিলিয়ে দিয়েছেন তিনি।
শালিক, টেলিগ্রাফের তার, কাঁঠালগাছ, শিউলি, আকাশ ও শহরের ব্যস্ততার চিত্রের মধ্য দিয়ে কবি তুলে ধরেছেন সময় ফুরিয়ে যাওয়ার অনুভূতি। বারবার ফিরে এসেছে প্রশ্ন কেন শূন্য হলো দিন?
এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে খেদ, ক্ষোভ ও হতাশা। কবিতাটিকে অনেকেই কবির দেশ ছাড়ার পূর্বাভাস এবং তার সৃষ্টিশীল জীবনের এক ধরনের অন্তর্গত সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।
দীর্ঘ বিরতির পর নতুন কবিতা
দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের বিরতির পর ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও। এতে স্থান পেয়েছে ৩৬টি কবিতা।
প্রবাসজীবনে লেখা এসব কবিতায় দেশ, স্মৃতি, বিচ্ছিন্নতা, সময় ও নাগরিক জীবনের নানা অনুভূতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। বৃষ্টি, বৃষ্টি কবিতাতেও এমন এক বৃষ্টির চিত্র পাওয়া যায়, যার স্রোতে ভেসে যায় নাগরিক জীবনের নানা পরিচিত বস্তু ও স্মৃতি। শহীদ কাদরীর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—অতি পরিচিত নাগরিক উপকরণকে ব্যবহার করে গভীর জীবনবোধ, বিষণ্নতা ও সময়ের অনুভূতি তৈরি করা।
প্রয়াণ
২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট নিউইয়র্কের নর্থ শোর বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২০ মিনিটে মারা যান শহীদ কাদরী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তার প্রয়াণে বাংলা কবিতার আধুনিক নাগরিক ধারায় তৈরি হয় এক গভীর শূন্যতা। তবে উত্তরাধিকা’, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই ও আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও সহ তার কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যে তাকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









