মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘি ইউনিয়নের গজারিয়া চকের প্রায় ৭ হাজার বিঘা কৃষিজমিতে বছরের ৭–৮ মাস পানি জমে থাকে। এতে তিন ফসলের জমিতে এখন অনেক কৃষক একটি ফসলও ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারছেন না। দীর্ঘদিনের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশ দিয়ে কালীগঙ্গা নদী পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ ভানুমতী খাল পুনঃখননের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দিঘি ইউনিয়ন ও মানিকগঞ্জ পৌরসভার কিছু অংশ নিয়ে গজারিয়া ও তাতি কালিয়ানি মৌজায় প্রায় ৭ হাজার বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। এসব জমিতে অন্তত দুই হাজার কৃষক কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। আগে এসব জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন হতো। তবে গত দেড় বছর ধরে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি ও বর্ষার পানি ৭–৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ায় সময়মতো চাষাবাদ করা যাচ্ছে না।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, গজারিয়া চক থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশ দিয়ে ভানুমতী খাল উপজেলা পরিষদ এলাকা পেরিয়ে সেওতা, ঘণ্টিপাড়া ও বান্দুটিয়ার ভেতর দিয়ে কালীগঙ্গা নদীতে গিয়ে মিশেছে। দীর্ঘদিন ভরাট হয়ে থাকায় খালটি দিয়ে পানি স্বাভাবিকভাবে নামতে পারছে না। খালটি পুনঃখনন করা হলে জলাবদ্ধতা কমবে এবং আগের মতো একাধিক ফসল চাষ করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
ভাটবাউর এলাকার কৃষক আমোজ উদ্দিন ও ইলেম উদ্দিন বলেন, ‘‘গজারিয়া চকে বছরের ৭–৮ মাস পানি জমে থাকে। ফলে বছরে একটি ফসল চাষ করা সম্ভব হয়। সেই ফসলও অনেক সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পানি নামতে দেরি হওয়ায় উঁচু জমিতে ফসল বড় হয়ে যায়। ফলে নিচু জমিতে সময়মতো চাষ করা যায় না।’’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাসুম ভূইয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আলী নূর জানান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা গজারিয়া চকের কৃষিজমি, কৃষক ও ফসল উৎপাদনের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য নেন। তার নির্দেশনার পর জলাবদ্ধতা নিরসনে ভানুমতী খাল পুনঃখননের প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়। পরে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আরিফ ফয়সাল খান স্বাক্ষরিত গত ৪ আগস্টের এক পত্রে খালটি পুনঃখননের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে এক্সকাভেটরের মাধ্যমে খাল পুনঃখননের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাক্কলন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খননের সময় খালের সঠিক ঢাল বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে পাড় বাঁধাইয়ের কাজ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। প্রাক্কলন তৈরিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সংশ্লিষ্ট এলাকার রেট শিডিউল অনুসরণের নির্দেশ রয়েছে।
পিআইও আলী নূর বলেন, ‘‘সরকারি নকশা অনুযায়ী খালটি প্রশস্ত ও পুনঃখনন করা হবে। কোথাও দখল থাকলে তা উচ্ছেদ করা হবে। নকশা অনুযায়ী পুনঃখননের প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলছে। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করে খননকাজ শুরু করা হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে কাজ শুরু করার আশা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়।’’
অন্য চকের জমিতেও জলাবদ্ধতা
গজারিয়া চকের বাইরে একই ইউনিয়নের মুলজান, করচাবাধা, ডাউটিয়া, রৌহাদহ ও ভাটবাউর এলাকার মাঝামাঝি মুলজান-করচাবাধা চকেও কয়েক শ একর কৃষিজমি দীর্ঘ সময় পানিতে তলিয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এসব জমি পানির নিচে থাকে।
বুধবার (১২ আগস্ট) দিঘি ইউনিয়ন পরিষদের পাশে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ইউপি সদস্য মো. শবজেল হোসেন, জেলা যুবদল নেতা আনিসুর রহমান ফরহাদ এবং কৃষক দুলাল উদ্দিন, নূর ইসলাম, মো. পান্নু, শহীদ, মোজাফফর ও আবুল হাশেমের সঙ্গে কথা হয়।
তারা বলেন, এই চক স্থানীয় কৃষকদের আয়ের অন্যতম উৎস। আগে এখানে বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন হতো। এখন জলাবদ্ধতার কারণে একটির বেশি ফসল করা যায় না। তাদের অভিযোগ, আগের সরকারের আমলে নেওয়া কিছু উন্নয়ন প্রকল্পে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যাটি আরও প্রকট হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, দিঘি ইউনিয়ন পরিষদের পাশ দিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশের খালের সঙ্গে প্রায় ৪০০ মিটার সংযোগ তৈরি করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা গেলে মুলজান, করচাবাধা, ডাউটিয়া, রৌহাদহ ও ভাটবাউর এলাকার চকের পানি বের করে দেওয়া সম্ভব। এতে জমিগুলোতে আবারও দুই থেকে তিনটি ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হবে।
জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা বলেন, “গজারিয়া চকের পানি নিষ্কাশনে ভানুমতী খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মুলজান-করচাবাধা চকের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও করা হবে। পরে যখন মানিকগঞ্জে আসব, তখন আমি নিজে চকটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









