রাজশাহীতে পান চাষ করে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না কৃষকরা। বাজারে পানের দাম কমে যাওয়ার বিপরীতে সার, কীটনাশক, বাঁশ, খড়, শ্রমিকের মজুরি ও সেচসহ পানবরজের বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রি করে সেই খরচও উঠছে না। এতে পান চাষ করে লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন জেলার হাজারো পানচাষি।
রবিবার (১৬ আগস্ট) সকালে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি পান হাটে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ভোর থেকেই ভ্যান, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনে করে পান নিয়ে হাটে আসছেন। হাটে পান নিয়ে আসার পর ক্রেতাদের কাছে দরদাম করছেন তারা। তবে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় অনেক কৃষকের মুখেই হতাশার ছাপ দেখা যায়। হাটে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে এক বিড়া অর্থাৎ ৬৪টি ছোট আকারের পান বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। মাঝারি আকারের পান বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৫০ টাকায়। আর তুলনামূলক ভালো মান ও বড় আকারের পান বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা বিড়া দরে। কৃষকদের ভাষ্য, গত সপ্তাহে পানের দাম আরও কম ছিল। চলতি হাটে কিছুটা দাম বাড়লেও তা উৎপাদন খরচের তুলনায় খুবই কম।
তারা জানান, বরজ থেকে এক বিড়া পান তুলতেই প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হলে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যায়। কিন্তু বাজারে অনেক সময় সেই পানের বিড়া ২০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে কৃষকের হাতে প্রকৃত লাভ থাকছে খুবই সামান্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লোকসানও হচ্ছে।
মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট এলাকার পানচাষি রফিক ইসলাম বলেন, “আমার দুই বিঘা জমিতে পানের বরজ করতে খরচ করেছিলাম প্রায় তিন লাখ টাকারও বেশি। কিন্তু বাজারে এসে আজকে পান বিক্রি করলাম ৩৫ টাকা বিড়া। এই দামে পান বিক্রি করে তো খরচই উঠছে না। এখন আবার সার-বিষের দামও বেড়েছে। সবকিছুর দাম বাড়লেও শুধু পানের দামই কম।” তিনি বলেন, পান চাষে কৃষকের বিনিয়োগ অনেক বেশি। কোনো রোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে অতিরিক্ত ওষুধ দিতে হয়। আবার অতিরিক্ত বৃষ্টি বা প্রতিকূল আবহাওয়ায় বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে খরচ করতে হয়। ফলে বাজারে ভালো দাম না পেলে কৃষকের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
মৌগাছি এলাকার পানচাষি জাহাঙ্গীর বলেন, “১৫ দিন আগে পানের দাম আজকের তুলনায় আরও কম ছিল। আজকের হাটে তাও কিছুটা দাম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমরা কৃষকেরা যে দাম পাচ্ছি, সেই তুলনায় আমাদের খরচ উঠছে না। আমরা চাই অন্তত এক বিড়া পানের দাম ১০০ টাকার ওপরে থাকুক। তাহলে কৃষকেরা কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারবে।” জহুরুল নামের আরেক পানচাষি বলেন, “পান চাষে দিন-রাত পরিশ্রম করতে হয়। বরজ তৈরির খরচ, সার-কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি সবই বেড়েছে। কিন্তু বাজারে পান বিক্রি করে আগের মতো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে খরচ বাদ দিয়ে হাতে তেমন কিছু থাকছে না।”
মৌগাছি পান হাটে আসা কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন পর্যায়ে তারা যে দাম পান এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পান যে দামে বিক্রি হয়, তার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
তবে হাটে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা কৃষকদের এই অভিযোগ পুরোপুরি মানতে নারাজ। তাদের দাবি, তারাও বর্তমানে খুব বেশি লাভ করতে পারছেন না। মোহনপুর এলাকার পান ব্যবসায়ী তৈয়বুর আলী বলেন, “এখন হাটে পানের প্রচুর আমদানি থাকায় দাম কিছুটা কম। আগে আমাদের রাজশাহীর পান ৬-৭টি দেশে রপ্তানি হতো। কিন্তু এখন সব বন্ধ। সেজন্য আগের মতো কৃষকেরা পানের দাম পাচ্ছেন না।” তিনি বলেন, “পানের দাম বাড়ানোর জন্য সরকারি ভাবে পরিকল্পনা প্রয়োজন। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত পান কোথায় এবং কীভাবে বাজারজাত হবে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।” ব্যবসায়ী তৈয়বুর আলীর মতে, স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানের বাজার সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া গেলে কৃষকরা ভালো দাম পেতে পারেন।
মৌগাছি হাটে নিয়মিত পান কেনাবেচা করেন কুতুব উদ্দিন। তিনি বলেন, “আমরা এই হাট নিয়মিত করি। আমরা হাট থেকে যে দামে পান কিনছি, সেই একই দামে আবার মোকামে গিয়ে পান বিক্রি করছি। এতে এখন আমাদেরও সেভাবে লাভ হচ্ছে না। আমরাও চাই পানের দাম বাড়ুক। কারণ এই দামে বিক্রি করলে কৃষকের কোনো লাভ হচ্ছে না।”
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৫ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। এ বছর পানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৮২৪ মেট্রিক টন। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি মৌসুমে পানের উৎপাদন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। অন্যদিকে চাহিদা সেই অনুপাতে না বাড়ায় পানের দাম কমেছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে সাধারণত পানের দাম কিছুটা কম থাকে এবং শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ে।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন বলেন, “সাধারণত উৎপাদনের তুলনায় বাজারে যদি কোনো পণ্যের চাহিদা কম থাকে, তাহলে সেই পণ্যের দাম কম থাকে। পানের উৎপাদন এখন বেশি, আবার বাজারে চাহিদাও কম। সেজন্য কৃষক পানের দাম কম পাচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, “বর্ষাকালে সাধারণত পানের দাম কম থাকে এবং শীতকালে পানের দাম বেশি থাকে। তবে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে নিয়মিত।”


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









