একসময় রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তারকাদের ঝলকানি। এখন যেন গল্পটা একটু অন্য রকম। গত দুই মৌসুমে বড় কোনো ট্রফি জেতেনি দলটি। তাই পুরোনো এক সমাধানের পথেই ফিরেছে রিয়াল—দলে ফিরেছে হোসে মরিনহো। ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মতো আরেকটি ট্রফিহীন সময়ের পর আবারও তার ওপর আস্থা রেখেছেন সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।
নতুন মৌসুমে রিয়ালকে দেখা যেতে পারে একটু বেশি হিসাবি, একটু বেশি রক্ষণাত্মক ফুটবলে। তার মানে অবশ্য আক্রমণে তারকার অভাব হচ্ছে না। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জুড বেলিংহাম, রদ্রিগো, আরদা গুলের, ব্রাহিম দিয়াজ ও এন্দ্রিকদের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছেন বার্নার্দো সিলভা ও ইয়ান দিয়োমান্দে।
রিয়ালের লক্ষ্যও পরিষ্কার—বার্সেলোনার টানা তৃতীয় লিগ শিরোপার স্বপ্ন থামানো এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের মঞ্চে আবারও শীর্ষে ওঠা। ১৫টি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা ও ৩৬টি লা লিগা জেতা ক্লাবটি সহজে পিএসজির নতুন আধিপত্য কিংবা বার্সেলোনার উত্থান মেনে নেওয়ার পাত্র নয়।
নতুন মৌসুমের আগে তাই কয়েকটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। মরিনহোর দ্বিতীয় অধ্যায় কি সফল হবে?
রিয়ালে মরিনহোর প্রথম অধ্যায় ছিল ২০১০ থেকে ২০১৩। সেই সময় একবার লা লিগা জিতেছিলেন তিনি, তিনবার চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালেও উঠেছিল দল। কিন্তু রিয়ালের মতো ক্লাবের জন্য সেটি পুরোপুরি সাফল্য ছিল না।
এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন। গত মৌসুমে কোচের পরিবর্তন, মাঠের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে রিয়াল বেশ অস্থির সময় পার করেছে। তাই পেরেজের আশা, মরিনহোর শৃঙ্খলা ও রক্ষণভিত্তিক ফুটবল দলের বিশাল তারকাবহরকে আবার সঠিক পথে নিয়ে যাবে।
প্রাক্-মৌসুমেও সেই ইঙ্গিত মিলেছে। দেপোর্তিভো লা করুনিয়ার বিপক্ষে ১-০ জয়ের ম্যাচে রিয়ালের ফুটবলে ছিল লড়াই, শারীরিক দৃঢ়তা ও ফল বের করে আনার মানসিকতা। যদিও ম্যাচটি ছিল প্রস্তুতি ম্যাচ এবং দুই দল মিলে অনেক বদলি খেলোয়াড় নামিয়েছে, রিয়ালের জয়ের ধরনটি মরিনহোর পুরোনো ফুটবলের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে।
নতুনদের দিয়ে কি আরো শক্তিশালী হবে রক্ষণ?
সমর্থকেরা হয়তো আলেসান্দ্রো বাস্তোনি, আশরাফ হাকিমি, মাইকেল ওলিসে, ভিতিনিয়া কিংবা রদ্রির মতো বড় নামের অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে রিয়াল এমন কিছু খেলোয়াড় এনেছে, যারা দলের নির্দিষ্ট দুর্বলতা পূরণ করতে পারে।
মার্ক কুকুরেয়া বাঁ দিকে ফের্নান্দ মেন্দির জায়গা নিতে পারেন। বল পায়ে তাঁর দক্ষতা ও কৌশলী ফুটবল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের সঙ্গে বোঝাপড়ায় কাজে লাগতে পারে। স্পেনের হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ জেতা এই ডিফেন্ডার রিয়ালের রক্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারেন।
ডান দিকে ডেনজেল ডামফ্রিস। আশরাফ হাকিমির মতো গতিশীল না হলেও শারীরিকভাবে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য। ইন্টারের হয়ে দুটি সিরি আ শিরোপা জেতার পাশাপাশি দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল খেলেছেন তিনি।
আর সেন্টারব্যাকে ইব্রাহিমা কোনাতে যোগ করেছেন গতি, শক্তি ও প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে ওঠার ক্ষমতা। দারুণ প্রতিভাবান দিন হুইসেন ও অভিজ্ঞ আন্তোনিও রুডিগারের সঙ্গে তাঁর জায়গার লড়াইও হতে পারে দেখার মতো।
এমবাপ্পে-ভিনিসিয়ুস আছেন, তবু গোল নিয়ে প্রশ্ন কেন?
রিয়ালের আক্রমণে তারকার অভাব নেই। কিলিয়ান এমবাপ্পে গত মৌসুমে ৪২ গোল করেছেন। ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপে আরও ১০ গোল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও বাঁ প্রান্তে নিজের কার্যকারিতা বহুবার প্রমাণ করেছেন।
তবু সমস্যাটা অন্য জায়গায়।
এত বড় দুই তারকাকে একসঙ্গে খেলিয়েও লা লিগায় রিয়ালের গোলসংখ্যা কমেছে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৮৭ গোল করা দলটি পরের মৌসুমে করেছে ৭৮, গত মৌসুমে ৭৭।
তাই প্রশ্ন—এমবাপ্পেকে কি মূল স্ট্রাইকার হিসেবেই খেলাবেন মরিনহো, নাকি তাঁকে আবার প্রান্তে সরিয়ে দেবেন? আর ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়?
মরিনহোর দলগুলো সাধারণত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দেরও রক্ষণে বেশি পরিশ্রম করায়। এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুসের মতো তারকাদের জন্য সেটি হয়তো খুব স্বাভাবিক ভূমিকা নয়। তবে এমবাপ্পে ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, মরিনহোর পরিকল্পনার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তিনি প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, মরিনহো এমন একজন কোচ, ‘যিনি জিততে জানেন’।
বেলিংহাম কি আবার গোলের নায়ক হবেন?
রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর ২০ বছর বয়সী জুড বেলিংহাম যেন ঝড় তুলেছিলেন। লা লিগায় প্রথম ১২ ম্যাচেই করেছিলেন ১০ গোল। পরে অবশ্য তাঁর গোলের ধার কমে যায় এবং এমবাপ্পে আসার পর তিনি ধীরে ধীরে মাঝমাঠের সহায়ক ভূমিকায় চলে যান।
এবার হয়তো সেই বেলিংহামকে আবার দেখা যেতে পারে।
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে তিনি আক্রমণে দুর্দান্ত ছিলেন। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, সতীর্থদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া এবং নিজে গোল করা—সবই করেছেন। সাতটি গোলও এসেছে তাঁর পা থেকে।
রিয়ালের মাঝমাঠে অরেলিয়েন চুয়ামেনি ও ফেদেরিকো ভালভার্দের মতো খেলোয়াড় থাকায় বেলিংহামের সামনে যাওয়ার স্বাধীনতা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে মরিনহো তাঁকে কতটা স্বাধীনতা দেবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আরদা গুলেরের সামনে কি কমে যাবে সুযোগ?
গত মৌসুমে রিয়ালের হয়ে ৫১টি ম্যাচ খেলেছেন আরদা গুলের। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছাড়া আর কেউ এত বেশি ম্যাচ খেলেননি। ফলে নতুন মৌসুমে তাঁকে নিয়মিত একাদশের খেলোয়াড় হিসেবেই ভাবা হচ্ছিল।
কিন্তু বার্নার্দো সিলভার আগমন সেই হিসাব কিছুটা বদলে দিতে পারে।
মরিনহো সাধারণত অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর বেশি আস্থা রাখেন। সিলভাও তাঁর পরিচিত একজন, দুজনই পর্তুগিজ ফুটবলের মানুষ। ফলে গুলেরের জন্য একাদশে জায়গা ধরে রাখা সহজ হবে না।
অথচ গুলের এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি এক মুহূর্তেই ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারেন। ড্রিবলিং, গতি ও সৃজনশীলতায় তাঁর মধ্যে আছে বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা। সুযোগ কমে গেলে তাই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এমনকি পুরোনো ক্লাব ফেনারবাহচেতে ফেরার কথা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
নয় নম্বরের খোঁজ কি শেষ হবে?
এমবাপ্পে নয় নম্বর জার্সি পরে খেললেও তিনি প্রচলিত অর্থে ‘টার্গেটম্যান’ নন। এন্দ্রিকও একই ধরনের সমস্যা তৈরি করেন। ৪৭.৫ মিলিয়ন ইউরোতে পালমেইরাস থেকে আসার পর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তিনি। পরে লিওঁতে ধারে গিয়ে পাঁচ গোল করেন, যার মধ্যে মেটজের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকও ছিল।
রিয়াল অবশ্য এখনো এন্দ্রিকের ওপর আস্থা রাখছে।
মরিনহোর চাওয়া হয়তো এমন একজন স্ট্রাইকার, যিনি বল ধরে রাখতে পারবেন, শারীরিক লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারবেন এবং বক্সের ভেতর সুযোগ কাজে লাগাতে পারবেন। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার কার্লোস এসপির মধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। ২১ বছর বয়সী এই তরুণ গত মৌসুমে লেভান্তের হয়ে ১১ গোল করেছেন। অভিজ্ঞতা কম, কিন্তু সম্ভাবনা আছে।
এখন দেখার বিষয়, রিয়াল শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পেকেই নয় নম্বর হিসেবে রাখবে, নাকি নতুন কোনো সমাধান খুঁজবে।
রিয়াল কি আবার রাজা হতে পারবে?
রিয়ালের হাতে তারকার অভাব নেই। আছে বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ, শক্তিশালী মাঝমাঠ এবং নতুন করে সাজানো রক্ষণ। কিন্তু ফুটবলে শুধু তারকার নাম দিয়ে শিরোপা জেতা যায় না—দরকার ভারসাম্য।
মরিনহোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও সেখানেই। রক্ষণকে শক্তিশালী করতে গিয়ে যেন এমবাপ্পে-ভিনিসিয়ুসের আক্রমণভাগের ধার ভোঁতা না হয়ে যায়। আবার তারকাদের স্বাধীনতা দিতে গিয়ে যেন দলগত শৃঙ্খলা নষ্ট না হয়।
বার্সেলোনা যদি টানা তৃতীয় লা লিগা জিততে চায়, আর রিয়াল যদি নিজেদের ৩৭তম শিরোপা ঘরে তুলতে চায়—তাহলে এই মৌসুমের গল্পটা হতে পারে দুই দর্শনের লড়াই। একদিকে বার্সার আক্রমণাত্মক ফুটবল, অন্যদিকে মরিনহোর শৃঙ্খলা ও রক্ষণ।
রিয়ালের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই—পুরোনো মরিনহো কি নতুন তারকাদের নিয়ে নতুন রিয়াল বানাতে পারবেন?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









