যশোর শহরের দড়াটানা থেকে হাসপাতাল মোড়গামী ব্যস্ত সড়কের ব্রিজের ফুটপাতে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বসছে মেঠো শাক সবজির বাজার। ডুমুর, কচুশাক, থানকুনি পাতা, কচুর ডাটা, ওলের ডাটা, কলার মোচা, কচুর ফুল, কলমি শাক, শাপলা, চালকুমড়ার শাকসহ নানা ধরনের দেশি শাকসবজি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ৩০ টাকায়। শহরের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসব কিনছেন। বিক্রেতাদের হিসাবে, এই পেশায় যুক্ত প্রায় ১০ থেকে ১২ জনের দৈনিক বিক্রি ৩০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।
শহরের ব্যস্ত সড়কের পাশে এই বাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ফরমালিন মুক্ত, সার ছাড়া পুষ্টিকর সবজি এবং কম দাম। অধিকাংশ শাক ১০ থেকে ২০ টাকা আঁটি। কোথাও কেজি হিসাবেও বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাশাপাশি এখন মধ্যবিত্ত এবং তুলনামূলক সচ্ছল ক্রেতারাও এসব পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন। বিক্রেতাদের দাবি, আগে মূলত দরিদ্র মানুষ এসব কিনলেও এখন ব্যক্তিগত গাড়িতে আসা ক্রেতারাও থামছেন। অনেকে দামাদামি না করে পণ্য নিয়ে যাচ্ছেন।
২৩ বছর ধরে ফুটপাতে শাকসবজি বিক্রি করছেন শাহেরা খাতুন। তার স্বামী রিকশা চালান। সংসারে স্বামীর আয় দিয়ে খরচ চালানো কঠিন হওয়ায় তিনি এই পেশায় যুক্ত হন। তার ভাষায়, ২০০৩ সালে যখন তিনি এখানে বসতেন, তখন এক আঁটি শাক বিক্রি করতেন মাত্র ২ টাকায়। তখন তার প্রধান ক্রেতা ছিলেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এখন সেই চিত্র বদলেছে। শাহেরা খাতুন বলেন, আগে গরিব মানুষই বেশি কিনত। এখন ধনী শ্রেণির মানুষও গাড়ি থেকে নেমে শাকসবজি কিনে নিয়ে যায়। অনেক সময় তারা দামদর করে না এবং ভাঙতি টাকাও ফেরত নেয় না। পরিচিত কিছু ক্রেতার জন্য তিনি আগেই ভালো শাকসবজি আলাদা করে রাখেন।
ফুটপাতের আরেক বিক্রেতা ললু শেখ বিক্রি করছেন মিষ্টি কুমড়া, আমড়া ও রাল শাক। মিষ্টি কুমড়া কেজি ৩০ টাকা, আমড়া কেজি ২০ টাকা এবং রাল শাক ১০ টাকা আঁটি। তার দৈনিক বিক্রি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। মাসে ৩০ দিন বিক্রি করতে পারলে মোট বিক্রির অঙ্ক দাঁড়ায় ১২ হাজার থেকে ১৫হাজার টাকা। ললু শেখের পাশে বসেন নাজির শংকরপুর এলাকার আল-আমিন। তার কাছে দেশি মাছের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। জাপানি মিনার কাপ মাছ কেজি ১৫০ টাকা, গ্লাসকাপ ১০০ থেকে ১২০ টাকা, সিলভারকাপ ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং ট্যাংড়া মাছ ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি। একই সঙ্গে কচুর ফুল ১০ টাকা আঁটি, চালকুমড়ার শাক ২০ টাকা আঁটি, কলমি শাক ১০ টাকা আঁটি এবং কলার মোচা ৩০ টাকা পিস দরে বিক্রি করছেন।
সদরের শিতারাপুর এলাকার এরশাদ প্রায় ১০ বছর ধরে এখানে পণ্য বিক্রি করছেন। তার কাছে রয়েছে বাদাবি লেবু, নারিকেল, পাকা কলা, কলার মোচা, পেঁপে ও আমড়া। বাদাবি লেবু মানভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকা পিস, নারিকেল ৮০ থেকে ১০০ টাকা, অমৃত সাগর কলা ৬০ টাকা ডজন, কলার মোচা ২০ থেকে ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ থেকে ৪০ টাকা এবং আমড়া ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি ধরনের পণ্য নিয়ে বসেছেন সদরের চাঁদপাড়া এলাকার আকরাম হোসেন। তার তালিকায় রয়েছে কচুর ডাটা, ওলের ডাটা, শাপলা, মিষ্টি কুমড়ার শাক, কচুর ফুল, কচুর শাক, পুঁইশাক ও থানকুনি পাতা। এসবের বেশিরভাগই ২০ টাকা আঁটি। পাশাপাশি বরজের মরিচ, কালা মরিচ, কামরাঙ্গা, বাদাবি লেবু, চালকুমড়া, পেঁপে এবং কচুর মুখির মোতা বিক্রি করছেন। কামরাঙ্গা, বাদাবি লেবু, চালকুমড়া ও পেঁপের কয়েকটি পণ্য ৩০ টাকা কেজি দরে এবং ডুমুর ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন তিনি। আকরাম হোসেন দুই বছর ধরে একই স্থানে বসছেন।
ঘোপ সেন্ট্রাল রোড এলাকার নুর নাহারের কাছে রয়েছে কলমি শাক, সানচি শাক, লোঞ্চি শাক, কচুর ফুল, কচুর লতি ও কাটা কচু। আর শহরতলীর ছোট শেখহাটি জামরুলতলা এলাকার নাজমা বেগম স্বামীর কৃষিকাজের আয়ের পাশাপাশি সংসারে বাড়তি আয় করতে এই বাজারে বসছেন। তার তিন সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি এই কাজ করছেন। তার কাছে রয়েছে কলমি শাক, সানচি শাক, কচুর ডাটা, কচুর ফুল, কলার মোচা, শাপলা, লতি, কৈ কাটা শাক, ডুমুর ও কাগজি লেবু। তার দৈনিক আয় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা বলে জানান তিনি।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, অধিকাংশের পুঁজির পরিমাণ কম। কেউ গ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে কুড়িয়ে এসব পণ্য আনেন, কেউ কম দামে সংগ্রহ করেন। ফলে প্রচলিত বাজারের তুলনায় তাদের সংগ্রহ ব্যয় কম। অন্যদিকে ফুটপাতে বসতে খরচ লাগে না। যে কারণে কম দামে বিক্রি করেও তারা কিছু আয় করতে পারছেন। তবে সব পণ্য প্রতিদিন বিক্রি হয় না।
আগে কম দামের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের নির্ভরতা বেশি থাকলেও এখন স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণেও অনেকে এসব শাকসবজি কিনছেন। কয়েকজন ক্রেতা বলেন, বাজারে প্রচলিত অনেক সবজির তুলনায় এসব দেশি শাকসবজির দাম কম। অনেক পণ্য গ্রামের আঙিনা, জমির আইল বা ঝোপঝাড় থেকে সংগ্রহ করা হয়। এসব সবজি রাসায়নিকমুক্ত ও সম্পূর্ণ বিষমুক্ত বলে দাবি তাদের।
এখানে কিনতে আসা হাবিবা সুলতানা নামের এক নারীর ক্রেতার সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, প্রক্রিয়াজাত বা অতিরিক্ত মসলা দেওয়া খাবারের তুলনায় প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এসব শাকসবজি তার কাছে বেশি পছন্দের। ১০ থেকে ২০ টাকায় অল্প পরিমাণ শাক কেনা যায়। এতে খরচও কম হয়, আবার গ্রামের সেই পরিচিত দেশি খাবারও পাওয়া যায়। আরেক রুবেল আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, আগে এসব শাকসবজি মূলত গ্রামের মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন শহরের মানুষও এগুলো খুঁজে কিনছেন। বিশেষ করে কলার মোচা, কচুর ডাটা, থানকুনি পাতা ও বিভিন্ন ধরনের শাকের চাহিদা রয়েছে।
তবে ফুটপাত ব্যবহার নিয়ে শহর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও রয়েছে। জেলা নাগরিক অধিকার আন্দলোনের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান মিঠু মনে করেন, পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত না করে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে নির্দিষ্ট জায়গায় বসার সুযোগ দেওয়া গেলে একদিকে তাদের জীবিকা বজায় রাখা সম্ভব, অন্যদিকে ফুটপাতও সুশৃঙ্খল রাখা যায়। পণ্যগুলোর পরিচ্ছন্নতা, ওজন, দাম এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি প্রয়োজন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









