শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। সেখানে সে পড়াশোনা করবে, শিখবে, বেড়ে উঠবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। কিন্তু কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি শিশুর নিরাপত্তাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশ্ন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়; প্রশ্ন ওঠে আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা, তদারকি এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ নিয়ে।
দেশে বিভিন্ন সময়ে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, স্কুল, হোস্টেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়। তবে প্রতিটি অভিযোগই আমাদের জন্য একটি সতর্কসংকেত। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকে, সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
কওমি মাদরাসাগুলোও এর বাইরে নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে। তাদের অনেকেই আবাসিক ব্যবস্থায় থাকে এবং দীর্ঘ সময় পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে কোনো অনিয়ম বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে শিশুর পক্ষে তা পরিবারকে জানানো অনেক সময় কঠিন হয়ে ওঠে। আবার ক্ষমতাধর শিক্ষক বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে অনিশ্চয়তাও কাজ করতে পারে। এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে শিশুকে আমরা কোথায় নিরাপদ রাখছি?
কোনো নির্দিষ্ট ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে যৌন নিপীড়নের সঙ্গে সমার্থক করে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি কোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার নামে অভিযোগকে আড়াল করা আরো বড় অন্যায়। শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রতিষ্ঠানটির নাম, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক মর্যাদা কোনোটিই এর চেয়ে বড় হতে পারে না। আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি বিশেষ বাস্তবতা রয়েছে। একটি শিশু যখন দিনের বড় একটি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটায় এবং রাতে সেখানেই থাকে, তখন তার দেখভালের দায়িত্বও অনেকাংশে প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। পরিবারের মতো ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ সেখানে সম্ভব না হলেও ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা অবশ্যই নিশ্চিত করা সম্ভব।
কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে লিখিত নীতিমালা নেই, অভিযোগ জানানোর স্বাধীন ব্যবস্থা নেই, শিক্ষক ও কর্মীদের যথাযথ যাচাইয়ের ব্যবস্থা দুর্বল এবং নিয়মিত তদারকিও সীমিত। কোনো অভিযোগ উঠলে অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরেই মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়। অথচ যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কোনোভাবেই শুধু ‘প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হতে পারে না। এটি শিশুর অধিকার, নিরাপত্তা ও আইনের প্রশ্ন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ক্ষমতার সম্পর্ক। একটি শিশু তার শিক্ষকের ওপর স্বাভাবিকভাবেই নির্ভরশীল। শিক্ষক তার কাছে জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্বের প্রতীক। এই সম্পর্কের অপব্যবহার হলে শিশুর পক্ষে প্রতিবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে যখন শিক্ষকই একই সঙ্গে শিক্ষাদাতা, তত্ত্বাবধায়ক এবং কখনো কখনো শিশুর দৈনন্দিন জীবনের প্রধান নিয়ন্ত্রক, তখন জবাবদিহির ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
পরিবার থেকে দূরে থাকা এই ঝুঁকিকে আরো বাড়াতে পারে। তবে, এটাও স্পষ্ট করে বলা দরকার-পরিবারের কাছে না থাকা যৌন নির্যাতনের কারণ নয়। নির্যাতনের মূল দায় সবসময় নির্যাতনকারীর। কিন্তু পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকা শিশুকে অভিযোগ জানানোর সুযোগ, মানসিক সহায়তা এবং বাইরের মানুষের নজর থেকে দূরে রাখতে পারে। ফলে ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র তিন পক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে।
এখানে কওমি মাদরাসার অর্থনৈতিক বাস্তবতাও আলোচনায় আসতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠান সীমিত অর্থে পরিচালিত হয়। শিক্ষকদের বেতন, আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় সামলানো কঠিন হয়। কিন্তু অর্থের সীমাবদ্ধতা শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অজুহাত হতে পারে না। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি মনে করে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও সমান নাগরিক এবং সমান অধিকারসম্পন্ন, তাহলে তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো তৈরিতে সহায়তাও করতে হবে।
প্রশ্ন হলো, কী করা যায়?
প্রথমত: প্রতিটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করা দরকার। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে কোন আচরণ নিষিদ্ধ, কোনো শিশু অভিযোগ করলে কীভাবে তা গ্রহণ করা হবে এবং অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত: শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই প্রয়োজন।
শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা ধর্মীয় জ্ঞান থাকলেই একজন ব্যক্তি শিশুদের সঙ্গে কাজ করার জন্য উপযুক্ত হয়ে যান না। শিশু মনোবিজ্ঞান, আচরণগত নিরাপত্তা এবং যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সম্পর্কেও তাঁদের প্রশিক্ষণ দরকার।
তৃতীয়ত: অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো শিশু যেন নিজের শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে বাধ্য না হয়। অভিভাবক, নির্ধারিত শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকতে হবে।
চতুর্থত: নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থার মূল্যায়ন করলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। তাই সরকারি কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
পঞ্চমত: অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সন্তান আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পড়লেও তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। শুধু পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, তা জানলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার মানসিক অবস্থা কেমন, কোনো শিক্ষক বা সহপাঠীর আচরণে সে অস্বস্তি বোধ করছে কি না, প্রতিষ্ঠানে সে নিরাপদ বোধ করছে কি না- এসব প্রশ্নও করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুকে বিশ্বাস করার সংস্কৃতি তৈরি করা। কোনো শিশু যদি বলে, ‘আমার সঙ্গে খারাপ কিছু হয়েছে’, তখন প্রথম প্রতিক্রিয়া যেন না হয় ‘তুমি ভুল বলছ’, ‘এ কথা কাউকে বলবে না’ কিংবা ‘প্রতিষ্ঠানের বদনাম হবে’। বরং তাকে বলতে হবে, ‘তোমার কথা আমরা শুনছি, তুমি একা নও। আমরা তোমার পাশে আছি।’ এই দুয়েকটি বাক্য অনেক শিশুর জীবন বদলে দিতে পারে।
আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সম্মান রক্ষার প্রবণতা অনেক সময় শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অনেকে মনে করেন, অভিযোগটি প্রকাশ্যে এলে পুরো প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত আসবে। এই ধারণা ভুল।
কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় একটি ধর্ম, শিক্ষাব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো ব্যক্তিকে জবাবদিহির বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। বরং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা আরো শক্তিশালী করতে হলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
একটি মাদরাসা তখনই সত্যিকার অর্থে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে, যখন সেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা নয়, নিরাপদ পরিবেশও পাবে। শিশুর নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তার মৌলিক অধিকার। সে সাধারণ স্কুলে পড়ুক, কওমি মাদরাসায় পড়ুক, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে থাকুক কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকুক- তার নিরাপত্তার মানদণ্ডে কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়।
তাই এখন প্রয়োজন অভিযোগ চাপা দেওয়া নয়, প্রতিরোধের কাঠামো তৈরি করা। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানকে শত্রু বানানো নয়, প্রতিষ্ঠানকে আরো নিরাপদ করা। প্রয়োজন কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা নয়, বরং অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
একটি শিশুর শৈশব একবারই আসে। সেই শৈশবের নিরাপত্তা যদি আমরা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে আমাদের শিক্ষা, নৈতিকতা ও সভ্যতার বড় বড় কথার অর্থ কী?
কওমি মাদরাসাসহ দেশের সব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে তাই এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন- শিক্ষার্থীদের আমরা শুধু শিক্ষা দেব, নাকি তাদের নিরাপদ রাখার দায়িত্বও নেব?
সময়ের দাবি হলো, দ্বিতীয়টির উত্তরটি যেন আর কোনোভাবেই ‘না’ না হয়।
লেখক: কলামিস্ট ও প্রকৌশলী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









