মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়ন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার জুড়ে দেওয়া 'নিজস্ব' শর্তে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। নিজস্ব শর্ত অনুযায়ী এমন সব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক সরানো হয়েছে, যেখানে আগে থেকেই শিক্ষকসংকট ছিল। একই সঙ্গে কয়েকটি বিদ্যালয়ে শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও নতুন শিক্ষক পদায়ন দেওয়া হয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এসব বদলি করা হয়। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে অধিকাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলি ও পদায়নে নানা
অসঙ্গতি করা হয়েছে।
সংকটের বিদ্যালয়েই কমেছে শিক্ষক
সদর উপজেলার নতুন পালড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি অনুমোদিত পদের মধ্যে দুটি আগে থেকেই শূন্য ছিল। চারজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেখান থেকে একজন সহকারী শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করায় বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন।
একই ধরনের পরিস্থিতি উত্তর মালুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। ছয়টি পদের বিপরীতে পাঁচজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও একজনকে সরিয়ে নেওয়ার পর শিক্ষকসংখ্যা নেমে এসেছে চারজনে। আফসার উদ্দিন মোল্লা, দক্ষিণ চৈল্যা ও কাটিগ্রাম-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই একটি করে পদ শূন্য ছিল। নতুন বদলির ফলে শূন্যপদের সংখ্যা আরো বেড়েছে, ফলে পাঠদান কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার সঙ্গে অসঙ্গতি
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২৯ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেখানে পাঁচজন বা তার কম শিক্ষক কর্মরত আছেন, সেসব বিদ্যালয় থেকে শিক্ষক বদলি করা যাবে না। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শূন্যপদের বিপরীতে বদলি দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু সদর উপজেলার একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বদলিতে এ নীতি অনুসরণ করা হয়নি।
শূন্যপদের চেয়ে বেশি শিক্ষক
কেবল শিক্ষকসংকট বাড়ানোই নয়, কিছু বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত শিক্ষক পদায়নের ঘটনাও ঘটেছে। পোরড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে একটি পদ খালি ছিল। অথচ একই আদেশে দুটি পৃথক বিদ্যালয় থেকে দুজন শিক্ষককে সেখানে পদায়ন করা হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে একজন শিক্ষক বেশি পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে গুজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সব পদ পূর্ণ থাকা অবস্থায় একজন শিক্ষককে অন্যত্র বদলি করায় সেখানে নতুন করে শূন্যপদ সৃষ্টি হয়েছে।
শূন্যপদ না থাকলেও পদায়ন
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে এমন দুটি বিদ্যালয়কে ঘিরে, যেখানে বদলির আগে কোনো শূন্যপদই ছিল না। মানিকগঞ্জ উত্তর বিদ্যালয় সংলগ্ন (৮৮ নম্বর) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুমোদিত ২৪টি পদের সবগুলোতেই শিক্ষক কর্মরত ছিলেন। তবুও সেখানে আরো একজন শিক্ষককে বদলি করে আনা হয়েছে। একইভাবে শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাতটি পদ পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও সেখানে একজন নতুন শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শূন্যপদের বিপরীতে বদলি হওয়ার কথা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে সেই নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।
বদলি আদেশে নতুন ‘সংযুক্তি’ শর্ত
বিতর্ক আরো বেড়েছে বদলি আদেশে যুক্ত করা দুটি বিশেষ শর্তকে কেন্দ্র করে। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো বিদ্যালয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শূন্যপদ না থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে সেখানে 'সংযুক্ত' হিসেবে গণ্য করা হবে। পরবর্তীতে পদ খালি হলে বদলির আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। তবে ২৯ জুলাইয়ের মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনে এমন কোনো ব্যবস্থার উল্লেখ নেই। ফলে উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের শর্ত আরোপের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ে কেন ভিন্ন চিত্র দেখা গেল এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘‘উপজেলা কমিটি গত ১১ আগস্ট মিটিংয়ের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর রেজুলেশন করে ১৮ আগস্ট অফিস আদেশের চিঠি দেওয়া হয়েছে।’’
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন বলেন, ‘‘প্রথমবার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভুল হয়েছে। আমি বদলি আদেশ সংশোধন করে নিয়েছি। প্রতিস্থাপন বাতিল করা হয়েছে। আর সংযুক্তির বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়েছে।’’
সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বাবুল আকতার বলেন, ‘‘অনেক সময় চাপে পড়ে, আত্মীয়-স্বজন হলে কিংবা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কারণে নীতিমালার বাইরে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারে।’’
মানিকগঞ্জের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা গকুল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘‘শূন্যপদ না থাকা অবস্থায় কোনো বিদ্যালয়ে শিক্ষক বদলি, সংযুক্তি কিংবা ভবিষ্যতে পদ খালি হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলি কার্যকর করার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণের জন্য বিভিন্ন স্তরে পৃথক কমিটিও আছে।’’
এ বিষয়ে জেলা পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদায়ন, বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘‘‘ইতোমধ্যে এ বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। বদলি আদেশ সংশোধনের জন্য নির্দেশ দিয়েছি।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









