২০০০ সালে রাউজানের গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের বাসিন্দা হিমাংশু দত্ত। ষাট বছর পূর্ণ হওয়ার চাকুরী জীবনের অবারিত নিয়মে ডাক আসে অবসরের।
তার শেষ কর্মদিবসটাই যে এতটা আলোকময় হয়ে উঠবে স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।
প্রতিদিন সাত সকালে বিদ্যালয়ে ছুটে গিয়ে যেই ঘন্টা বাজিয়ে কর্মজীবন শুরু হতো তার সেই ঘন্টা বাজিয়েই আজ চাকুরী জীবন থেকে চিরছুটি নিয়েছেন হিমাংশু।
তার বিদায় সংবর্ধনাকে ঘিরে বিদ্যালয়ের পুরো আয়োজনটাই ছিল গৌরবদীপ্তময়।
২৬ বছরের কর্মজীবনে এই প্রথম বসার সুযোগ হয়েছে অতিথির আসনে। মঞ্চে সভাপতি, প্রধান অতিথি আর বিশেষ অতিথিদের ভীড়ে অনুষ্ঠানের মধ্যমনি তিনি। গলায় ফুলের মালা জড়িয়ে অতিথির আসনে বসেও নির্লিপ্ত হিমাংশু। বুঝার উপায় নেই, আজই এই বিদ্যালয়ে শেষ কর্মদিবস।
এভাবেই একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর বিদায় বেলাটা রাঙিয়ে দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (৩১ আগস্ট) চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিমাংশু দত্তকে অবসরকালীন বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার আলোকিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়।
বিদ্যালয় হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কমিটির সদস্য সচিব কনক দাশ গুপ্তের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক শেখ মোহাম্মদ আলাউদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন রাউজান প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নেজাম উদ্দিন রানা, প্রবাসী মোহাম্মদ হারুন। বক্তব্য রাখেন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপ্লব কুমার ধর, সিনিয়র শিক্ষক শম্ভুনাথ পারিয়াল, বাপ্পী দাশ, শিক্ষক প্রতিনিধি সদস্য মোহাম্মদ গোলাম ফারুক, প্রভাস কুমার ধর,লাবনী প্রভা দত্ত, পিংকী শীল, সহকারী শিক্ষক সুমন বড়ুয়া, সুমন কান্তি দাশ,আশিষ দাশ,দীপিতা দেব, মোস্তেকা খাতুন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহেলা কাশেম আর্থী ও সৌম্য আকতারের যৌথ সঞ্চালনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আলিফা খানম। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা দীপিতা দেব ও তার দল এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুন দে।
২৬ বছরের কর্মজীবনে এই প্রথম বসার সুযোগ হয়েছে অতিথির আসনে। মঞ্চে সভাপতি, প্রধান অতিথি আর বিশেষ অতিথিদের ভীড়ে অনুষ্ঠানের মধ্যমনি তিনি। গলায় ফুলের মালা জড়িয়ে অতিথির আসনে বসেও নির্লিপ্ত হিমাংশু। বুঝার উপায় নেই, আজই এই বিদ্যালয়ে শেষ কর্মদিবস।তার, আর পুরো আয়োজনটাই চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিমাংশুকে ঘিরে।
একজন কর্মচারীর বিদায় বেলায় অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কেঁদেছেন শিক্ষকরা। হাতে তুলে দেওয়া হলো ক্রেস্ট, নানান উপহার।
আলোচনা পর্ব শেষে গলায় মালা পড়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন ঝুলে থাকা ঘন্টার দিকে। বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থী অপেক্ষমান। হিমাংশু শেষ বারের মতোন ঘন্টা বাজানোর পর শিক্ষার্থীর তাড়াহুড়ো করে বাড়ির পথ ধরেননি। হিমাংশুকে শেষবারের মতো এগিয়ে দিকে তার পিছু পিছু হাঁটলেন গেইট অবধি। সেখানে বিদ্যালয় সভাপতির ফুল দিয়ে সাজানো গাড়ি অপেক্ষমান ছিল হিমাংশুকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। গাড়ি পর্যন্ত একসাথে বিদায় দিলেন বিদ্যালয়ের সভাপতি, প্রধান শিক্ষক, সকল শিক্ষকমন্ডলী, শিক্ষার্থীরা।
দামী গাড়ির সামনের আসনে গলায় ফুলের মালা পড়ে বসে থাকা হিমাংশুর চোখেমুখে লজ্জার ছাপ! এমন অভিজ্ঞতা জীবনে প্রথম হয়তো।
শেষবারের মতোন কর্মস্থলের দিকে চোখ মেলে তাকালেন। দীর্ঘ ২৬ বছরের কত্তো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠানে। শুরু থেকে শেষ অবধি নিজেকে সামলাতে পারলেও গাড়ী বিদ্যালয় চত্বর পার হওয়ার সময় হিমাংশুর চোখজোড়া জলে ভরে উঠল।
যাওয়ার প্রাক্কালে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুকণা যেন বিদ্যালয়ের প্রতি তার সীমাহীন মায়া, আর নির্ভেজাল ভালবাসার স্মৃতি চিহ্ন।
গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি শেখ মোহাম্মদ আলাউদ্দীন বলেন, একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও দায়িত্বের প্রতি শতভাগ নিষ্ঠা, সততা আর নীতির প্রতি অবিচল থাকার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গুজরা শ্যামাচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের কর্মচারী হিমাংশু দত্ত। বিদায় বেলায় এত সম্মান তার গৌরবময় কর্মজীবনের পুরষ্কার। হিমাংশু দত্তরা এই সমাজেরই গৌরব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









