শিল্পাঞ্চল ও বন্দরনগর চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের কারণে সীতাকুণ্ডে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াত করেন। শ্রমিক, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিত্যদিনের চলাচলের অন্যতম প্রধান ভরসা বাস, লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। তবে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায়, যানবাহনের সংকট এবং রুটভেদে ভাড়ার অস্পষ্টতায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্নআয়ের শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ।
সীতাকুণ্ড পৌরসদর, কুমিরা, ভাটিয়ারী, মাদামবিবিরহাট, বাঁশবাড়িয়া, বাড়বকুণ্ড ও ফৌজদারহাট এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রীদের চাপ থাকে। বিশেষ করে শিল্পকারখানার শ্রমিকরা নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করেন। সকাল ও বিকেলের ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের চাপ বাড়লে অনেক সময় যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। পর্যাপ্ত যানবাহন না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ার বিকল্প পরিবহনে উঠতে হয় অনেককে।
স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ, কিছু যানবাহনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের চাপ বেশি থাকলে কিংবা সন্ধ্যার পর যানবাহন কমে গেলে এই প্রবণতা আরও বাড়ে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ার বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেক যাত্রী প্রতিবাদও করতে পারেন না।
সীতাকুণ্ডের স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ রিজভী বলেন, প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে গাড়িতে যাতায়াত করতে হয়। অনেক সময় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিতে হয়। একদিনে কয়েক টাকা বেশি মনে হলেও প্রতিদিন এভাবে দিতে হলে মাস শেষে বাড়তি খরচ অনেক বেড়ে যায়। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এই বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন।
সীতাকুণ্ডে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ যে নতুন নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় চলতি বছরের মার্চে ভাটিয়ারী এলাকায় পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগে তিনটি বাসকে পৃথক মামলায় মোট ৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানের সময় যাত্রীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম না করার জন্য পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়।
পরিবহন সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টিও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় যানবাহনকে অপেক্ষা করতে হলে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে যায়। এতে ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের চাপ আরও বেড়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যানবাহনের স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও ওঠে।
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে যানবাহন পরিচালনার খরচও বাড়ে। তবে ভাড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা প্রয়োজন। চালক বা পরিবহন মালিকের ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করলে যাত্রীদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নির্ধারিত ভাড়া মেনে চলার পাশাপাশি যাত্রীদের সঙ্গেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
যাত্রীরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রতিটি রুটের নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বাস, লেগুনা ও অন্যান্য গণপরিবহনে দৃশ্যমানভাবে টানানো, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিক উভয়ের মধ্যে ভাড়া নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে।
সীতাকুণ্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানকার গণপরিবহন স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। প্রতিদিন হাজারো শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষ উপজেলার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে চট্টগ্রাম নগর ও আশপাশের এলাকায় যাতায়াত করেন। তাদের সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি স্বল্প খরচে নিরাপদে যাতায়াতের সুযোগ পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সীতাকুণ্ডে যাত্রীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বিআরটিএ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করা, পর্যাপ্ত যানবাহন নিশ্চিত করা, ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা গেলে যাত্রী হয়রানি অনেকটাই কমানো সম্ভব। শিল্পের বিস্তারের সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজনও বাড়ছে। তাই সীতাকুণ্ডে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নিয়মতান্ত্রিক গণপরিবহন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









