সবুজ পাহাড়ের বুকজুড়ে জুমের ধানে এখন সোনালি রোদের খেলা। বাতাসে দোল খাচ্ছে আধা পাকা ধানের সোনালি শিষ, আর তার সঙ্গেই ভেসে আসছে পাহাড়ি জুমচাষিদের ঘামে ভেজা তৃপ্তির ঘ্রাণ। কোথাও ধান কাটার ধুম, কোথাও ফসল পাহারা দিতে জুমঘরে নির্ঘুম রাত, আবার কোথাও সাথি ফসল তোলার প্রাণবন্ত ব্যস্ততা। বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে বোনা স্বপ্নগুলো ভাদ্রের রোদে সোনা হয়ে ঝরে পড়ছে।
দুর্গম পাহাড়ি ঢালে জুমচাষিদের ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দ। বান্দরবানের লামা উপজেলার চিংকুম ম্রো পাড়ায় গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। পাহাড়ি ঢালে বাঁশের মাচাং ঘরে বসে জুম পাহারা দিচ্ছেন চিংরুং ম্রো।
অবসরের পর ঘরে বসে না থেকে ফিরে গেছেন রক্তে মিশে থাকা জুমের মাঠে। এবার তিন একর জমিতে জুম বুনেছিলেন তিনি। ফলন নিয়ে আশাবাদী চিংরুং ম্রো বলেন, ‘‘আগে সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হলে জুমের ধান ভালো হতো। এখন সময়মতো রোদ-বৃষ্টি হয় না। প্রকৃতিও যেন উল্টো হয়ে গেছে। তারপরও এ বছর জুমের ফলন নিয়ে আমি আশাবাদী।’’
তিনি আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে এবার তার জমি থেকে ১৫০ থেকে ২০০ আড়ি ধান ঘরে উঠবে।
জুমের বিশেষ বৈচিত্র্য তুলে ধরে চিংরুং ম্রো আরও বলেন, ‘‘জুমে শুধু ধান হয় না। বেগুন, মারফা, তিল, যব, ভুট্টা, চিনাল, মরিচ, রোজেলাসহ ৩০-৩৫ ধরনের সাথি ফসল হয়। বাজার থেকে শুধু লবণ আর নাপ্পি (এক ধরনের শুঁটকি) কিনলেই চলে। জুম যেন আমাদের জন্য একটি বাজারের মতো।’’
বাবার সাথে জুম পাহারা দিচ্ছে তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে চম্পা ম্রো। কপালে ঘামের বিন্দু মুছে সে বলে, ‘‘জুম না করলে আমরা কী খাব? জুম আমাদের ঐতিহ্য, প্রতিবছরই আমরা জুম চাষ করি।’’
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এই জুমের জীবনচক্র যেন প্রকৃতির সঙ্গেই বাঁধা। নভেম্বর-ডিসেম্বরে জঙ্গল নির্বাচন, জানুয়ারিতে ঝোপঝাড় কাটা, মার্চ-এপ্রিলে ‘ফায়ারিং লাইন’ তৈরি করে পোড়ানো এবং বৈশাখের প্রথম বৃষ্টিতে বীজ বোনা হয়। এরপর আগস্টের শেষ থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর পালা। আর অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ অবধি প্রতিটি পাহাড়ি পাড়ায় বাজে নতুন চালের নবান্ন উৎসবের সুর।
লামা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অঞ্জুশ্রী চৌধুরী জানান, চলতি বছর লামায় ২ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। জুমে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাথি ফসলও উৎপাদন হয়ে থাকে।
ফলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এ বছর জুমের ফলন ভালো হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। তবে পার্বত্য অঞ্চল হওয়ায় সব জায়গায় সমানভাবে বৃষ্টিপাত হয় না, ফলে একেক এলাকার ফলন একেক রকম হয়।’’
স্থানীয় বাসিন্দা রিংচুম মুরুংয়ের ভাষায়, ‘‘পাহাড়ের আদি বাসিন্দাদের কাছে জুম এক টুকরো জমি বা ফসল নয়। জুম তাদের অস্তিত্ব, বেঁচে থাকার অবলম্বন আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা সংস্কৃতির অমলিন ধারা।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









