ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমের অবসান ঘটিয়ে ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে যখন শীতের আমেজ ছুঁয়ে যায়, তখনই প্রকৃতির ক্যানভাসে রঙ ছড়াতে শুরু করে শরতের সাদা কাশফুল। পাহাড় ঘেরা সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশ, মহামায়া লেকের চারপাশ কিংবা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উভয় পাশের রেললাইনের ধার—সবখানেই এখন রূপালী হাসিতে মেতে উঠেছে কাশবন। ইট-পাথরের কংক্রিট যুগের এই ব্যস্ত জনপদে শরতের এই চাদর যেন ক্লান্তি ভুলিয়ে দিচ্ছে পথচারী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের। হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ রূপ আর পাহাড়ি সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে সীতাকুণ্ডের প্রান্তর জুড়ে এখন বইছে এক নান্দনিক মুগ্ধতার হাওয়া।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ি ঝরনার ধার ঘেঁষে এবং সমতল ভূমির ফাঁকা জায়গাগুলোতে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাশবনগুলোতে এখন দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে মহামায়া লেক ও গুলিয়াখালী এলাকার কাশফুলের মাঠে তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। বাতাসে দোদুল্যমান এই সাদা ফুলের সঙ্গে সেলফি বা ছবি তোলার হিড়িক পড়ে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন ও মাটি ভরাটের কারণে আগের মতো বড় বড় কাশবন আর চোখে পড়ে না, যা স্থানীয় প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে কিছুটা আক্ষেপের জন্ম দিয়েছে।
প্রকৃতির এই রূপ বদল নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে স্থানীয় তরুণ আলোকচিত্রী ও কলেজছাত্র তানভীর আহমেদ বলেন, সীতাকুণ্ডের পাহাড় আর সমুদ্র তো সবসময়ই সুন্দর, কিন্তু শরৎকালের এই কয়েকটা দিন এখানকার রূপ যেন একেবারেই আলাদা হয়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সাদা কাশফুলগুলো বাতাসে দুলছে, তখন মনটা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। শহরের যান্ত্রিকতা থেকে একটু শান্তি খুঁজতে আমরা বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই এই কাশবনগুলোতে আসি। তবে দুঃখের বিষয় হলো, যত্রতত্র বাড়িঘর আর মাটি ভরাটের কারণে আমাদের শৈশবের সেই বিশাল কাশবনগুলো এখন আর আগের মতো দেখা যায় না।
একইভাবে প্রকৃতির এই রূপ সুধা উপভোগ করতে আসা স্থানীয় অপর প্রকৃতিপ্রেমী ও প্রবীণ বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম আক্ষেপের সুরে বলেন, ছোটবেলায় সীতাকুণ্ডের প্রতিটি খালের ধার ও খোলা মাঠে দলবেধে কাশফুল ফুটতে দেখতাম। চারপাশের সেই রূপালী প্রান্তর এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। চোখের সামনে ইটভাটা আর বহুতল বাড়িঘর তোলার কারণে কাশবনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এরপরও শরৎকালে যখন এই ফুলগুলো ফোটে, তখন পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়। আমাদের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কাশফুল কেবল রূপালী সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষারও একটি অংশ। নদীর তীর, পাহাড়ি ঢাল বা খালের পাড় রক্ষা করতে এই গাছগুলোর শিকড় দারুণভাবে কাজ করে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জলাভূমি ভরাটের কারণে এই বুনো ফুলগুলো আজ হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। প্রতি বছর শরৎকালে যে পরিমাণ কাশবন প্রাকৃতিকভাবে ফোটার কথা, কংক্রিটের আগ্রাসনে তার বড় অংশই এখন চিরতরে হারিয়ে গেছে।
শরতের এই সৌন্দর্য রক্ষা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সীতাকুণ্ড তার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত। পাহাড়, সমুদ্র ও ঝরনার পাশাপাশি আমাদের এখানকার ঋতুভিত্তিক রূপও অনন্য। শরৎকালের কাশফুল আমাদের পরিবেশের সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তবে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা বা জলাভূমি ভরাটের মাধ্যমে প্রকৃতি ধ্বংস করার কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসন সবসময় কঠোর নজরদারি রাখছে এবং সাধারণ মানুষকেও পরিবেশ সুরক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে জীবনের হাঁপিয়ে ওঠা মানুষদের মানসিক প্রশান্তি দিতে এই ধরনের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি। কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি জীবনে শরতের কাশফুল মানুষের মনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। সীতাকুণ্ডের এই চিরচেনা রূপ ধরে রাখতে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপই নয়, প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের সচেতনতা। পাহাড় ও সমতলের এই অপরূপ রূপালী সুষমা বাঁচিয়ে রাখতে পারলে তবেই আগামী প্রজন্ম উপভোগ করতে পারবে সত্যিকারের প্রকৃতির রূপ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









