গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠা করা হলেও, সীতাকুণ্ডে এর বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। চিকিৎসক সংকট, ওষুধের অভাব আর চরম অব্যবস্থাপনার কারণে উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আজ নিজেই যেন ধুঁকছে। সামান্য জ্বর-সর্দির চিকিৎসাও ঠিকমতো না পাওয়ায় এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ।
উপজেলার বাড়বকুণ্ড, সৈয়দপুর, মুরাদপুর, কুমিরা ও ভাটিয়ারীসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, আবার কোথাও স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। প্রাপ্ত তথ্যমতে, উপজেলার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এমবিবিএস চিকিৎসকের পদ শূন্য কিংবা কাগজে-কলমে পদ থাকলেও বাস্তবে তাদের দেখা মেলা ভার। বাধ্য হয়ে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) কিংবা ভিজিটরদের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে রোগীদের। স্থানীয়দের অভিযোগ, সপ্তাহে দু-একদিনের বেশি চিকিৎসকদের দেখা যায় না। পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর এই বেহাল দশায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা। প্রসূতিদের জরুরি সেবা, টিকাদান ও স্বাভাবিক প্রসবের জন্য এই কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করার কথা থাকলেও, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সামান্য কাটাছেঁড়া বা সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্যও গ্রামের দরিদ্র মানুষদের ছুটতে হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা শহরের ব্যয়বহুল বেসরকারি ক্লিনিকে। এতে সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ।
কুমিরা ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা গৃহবধূ রহিমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বাচ্চাটার খুব জ্বর নিয়ে সকাল থেকে বসে ছিলাম, কিন্তু কোনো বড় ডাক্তার নাই। যিনি আছেন তিনি শুধু একটা প্যারাসিটামল আর গ্যাস্ট্রিকের বড়ি লিখে দিলেন, সরকারি ওষুধও নাকি শেষ! এমন স্বাস্থ্যকেন্দ্র দিয়ে আমাদের কী লাভ, যদি দরকারে ডাক্তারই না পাই? বাধ্য হয়ে শহরের ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে, যা আমাদের মতো গরিবের জন্য মরণফাঁদ।"
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কখনোই কমানো সম্ভব নয়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে এসব কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার, নিয়মিত চিকিৎসক উপস্থিতি এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ একান্ত জরুরি।
ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর এই অচলাবস্থা ও কার্যকারিতা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) জানান, "সীতাকুণ্ডের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জনবল ও চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। চিকিৎসকদের নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে আমরা এখন অত্যন্ত কঠোর নজরদারি রাখছি। এছাড়া জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার ও পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে এবং মানুষ বাড়ির কাছেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবে।"
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা আশ্বাসের কথা শোনানো হলেও, বাস্তবে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দৃশ্যমান কোনো উন্নতি এখনো চোখে পড়ছে না। সীতাকুণ্ডের প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









