সখীপুরের যাদবপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী দেওদিঘী বাঁশের হাট সখীপুর উপজেলা ও পাশ্ববর্তী মির্জাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে যুগ যুগ ধরে জনপ্রিয়। বাঁশের ব্যবসার সাথে যে সকল ক্ষুদ্র মাঝারি ও বড় আকারের ব্যবসায়ী সম্পৃক্ত রয়েছেন তাদের পূর্বপুরুষরাও কেউ কেউ এই একই ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন।
সখীপুর উপজেলার হাতীবান্ধা, দাড়িয়াপুর, গজারিয়া, কালিদাস, প্রতিমা বংকী, বোয়ালী, বহুরিয়া, তক্তারচালা, নলুয়া, আমেরচারা, শোলাপ্রতিমা, দেওবাড়ী, শালগ্রামপুর, হতেয়া রাজাবাড়ি, কামালিয়াচালা, হলুদিয়া চালা, গাবলের বাজার, মহানন্দপুর, কচুয়া, গড়গোবিন্দপুর, শালগ্রামপুর, বড়চওনা, কীর্তনখোলা, মুচারিয়া পাতার, কালমেঘা, বেড়বাড়ী রতনপুর, চাকদহ, হাতীবান্ধা, ইছাদিঘী, কালিদাস সহ সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বাঁশের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। কেউ কেউ বাড়ি থেকে বাঁশ কেটে এনে দেওদীঘি বাজারে বিক্রি করে। আবার কেউবা গ্রাম্য ব্যাপারিদের কাছে বাড়ি থেকেই তাঁদের বাঁশের ঝাঁড় পাইকারী দামেই বিক্রি করে দেন।
প্রতি সপ্তাহে একদিন দেওদিঘী বাজারে বাঁশের হাট বসে। ঐ দিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাঁশ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বড় পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা বাঁশ ক্রয় ট্রাক ভর্তি করে শহরে নিয়ে যায়। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল, কাইতলা, হাঁটুভাঙা গ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মানুষের কাছেও যুগ যুগ ধরে এই ঐতিহ্যবাহী দেওদিঘী বাঁশের বাজার খুবই জনপ্রিয়।
বাঁশ প্রয়োজনীয় একটি দ্রব্য। বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র তৈরি করা যায়। আগেকার দিনে মাটির ঘরে ও টিনের ঘরে বাঁশের তৈরী তালাই ঘরের সিলিং হিসেবে এবং ঘরের খুঁটি হিসেবেও বাঁশ ব্যবহার করা হতো। বাঁশ কাগজ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বহুতল ভবন নির্মাণের সময় বাঁশ দিয়ে উচ্চ আকৃতির চঙ্গ বানিয়ে নির্মাণ শ্রমিকরা ভবনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজে বাঁশ ব্যবহার করে থাকে। যখন আমাদের গ্রামাঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না তখন দেখা যেত গ্রামআঞ্চলে অবস্থিত নদীর এপার থেকে ওপারে পারাপারের জন্য এবং এক গ্রামের মানুষ অন্য গ্রামে যাতায়াতের জন্য নদীর উপরে বাঁশ দিয়ে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করত। বাঁশ দিয়ে তৈরি বাঁশের সাঁকোই ছিল নদী পারাপারের মাধ্যম। তাছাড়া আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের লোকজন বাঁশের তৈরি বিভিন্ন হরেক রকমের তৈজসপত্র তৈরী করে এবং পাহাড়ি এলাকায় ঘরবাড়ি তৈরীর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে বাঁশ ব্যবহার করে থাকে। সর্বোপরী মানুষের প্রয়োজনীয় নানাবিধ উপকারে বাঁশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নলুয়া বাজার বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান শাহীনুর রহমান বলেন, বাঁশ আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের একটি প্রতীকস্বরুপ।
পারিবারিকভাবে ছোটবেলা থেকেই বাঁশ আমাদের অতি পরিচিত। পারিবারিক জমিতে পূর্বপুরুষদের রেওয়াজ অনুযায়ী বাঁশছোপে বাঁশের চারা রোপন করে থাকি। প্রতিবছর বাঁশ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা যায় এবং কৃষি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাঁশের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মৌশা গ্রামের বাঁশ ব্যবসায়ী মো: মোবারক মিয়া বলেন, সখীপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দেওদীঘি বাজারে প্রতি সপ্তাহেই বাঁশের হাট বসে। আমি দীর্ঘদিন ধরে বাঁশ ব্যবসার সাথে জড়িত আছি। বাঁশ ব্যবসা থেকে যে অর্থ উপার্জন করি তাই দিয়ে সংসার চালাই। সপ্তাহে একদিন ঢাকা থেকে ট্রাক নিয়ে বড় বড় বাঁশব্যবসায়ীরা দেওদিঘী বাজারে আসে। বাজার থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাঁশ ক্রয় করে শহরে নিয়ে যায়।
হতেয়া রাজাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা নিয়ামুল হক বলেন, আমাদের সখীপুর পাহাড়ি এলাকা। ছোটবেলা থেকেই সখীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ধরনের বাঁশ দেখতে পেয়েছি। কড়ই বাঁশ, ওড়া বাঁশ, নলতল্লা বাঁশ, কায়েঠেঙ্গি বাঁশ, তল্লা বাঁশ, তড়ই বাঁশ, বৈড়া বাঁশ ইত্যাদি। বিভিন্ন তৈজসপত্র ও প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাঁশ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। তাছাড়া বাঁশ বিক্রি করেও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। আমাদের পারিবারিক জমিতে বাঁশছোপ রয়েছে। প্রতি বছর বাঁশ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন হয় তা সংসারের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা পালন করে থাকে।
কাওছার আল হাবীব/এদিন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









