দূর থেকে চোখে পড়ে কালো পাথরে মোড়া এক অপূর্ব স্থাপত্য। কাছে গেলেই ইতিহাস যেন কথা বলতে শুরু করে। পনেরোটি গম্বুজ, পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, খিলান আর শত শত বছরের পুরোনো স্থাপত্যশৈলী—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, বাংলার সুলতানি যুগের এক অনন্য স্মারক। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গৌড়ের প্রাচীন জনপদের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিই ছোট সোনামসজিদ।
‘সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন’ হিসেবে পরিচিত ছোট সোনামসজিদ চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৫-৩৮ কিলোমিটার দূরে শাহবাজপুর এলাকায় অবস্থিত। প্রাচীন গৌড়ের স্মৃতিবিজড়িত এ মসজিদটি আজও দেশ-বিদেশের পর্যটক, ইতিহাসপ্রেমী ও স্থাপত্য গবেষকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।
হোসেন শাহের আমলের স্মারক:
ইতিহাসের পাতা বলছে, মসজিদটি নির্মিত হয় বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে, ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। মসজিদের প্রধান প্রবেশপথের ওপরের শিলালিপিতে নির্মাতার পরিচয় পাওয়া যায়। সেখানে জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস মজলিস-ই-মনসুর ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলী-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। তবে শিলালিপির নির্মাণ-তারিখের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সুনির্দিষ্ট সাল জানা যায় না। অর্থাৎ, লোকমুখে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো যে পরিচিতি, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি থাকলেও সুনির্দিষ্ট নির্মাণসাল হিসেবে একটি বছর উল্লেখ করার সুযোগ নেই।
মসজিদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক সোনালি অধ্যায়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এর গম্বুজ ও বাইরের অংশে একসময় সোনালি আস্তরণ ছিল। সূর্যের আলো পড়লে স্থাপনাটি সোনার মতো ঝলমল করত। সেই থেকেই এর নাম হয় ‘সোনা মসজিদ’। আর ভারতীয় ভূখণ্ডে একই অঞ্চলে তুলনামূলক বড় আরেকটি সোনা মসজিদ থাকায় বাংলাদেশের স্থাপনাটি পরিচিতি পায় ছোট সোনামসজিদ নামে। বর্তমানে সেই সোনালি আস্তরণ আর নেই।
স্থাপত্যশৈলীর অনন্য বৈশিষ্ট্য:
ছোট সোনামসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর ছাদে থাকা ১৫টি গম্বুজ। এগুলোর মধ্যে ১২টি অর্ধগোলকাকার এবং মধ্য সারির তিনটি চৌচালা ধাঁচের। এই গম্বুজগুলো একসময় স্বর্ণমণ্ডিত ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও পর্যটন-তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
মসজিদে রয়েছে মোট ১১টি প্রবেশপথ—পূর্ব দেয়ালে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি করে। চার কোণে রয়েছে অষ্টকোণাকার বুরুজ। মসজিদের দেয়ালে কালো পাথরের ওপর ফুল, লতাপাতা ও অন্যান্য নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ স্থাপনাটিকে দিয়েছে অনন্য সৌন্দর্য। ইটের মূল কাঠামোর ওপর পাথরের আবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বাইরে থেকে মসজিদটি সম্পূর্ণ পাথরের তৈরি বলে মনে হলেও এর ভেতরের মূল কাঠামো ইটের। এই ইট ও পাথরের সমন্বয়ই সুলতানি স্থাপত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
মসজিদের উত্তর-পশ্চিম অংশে একটি উঁচু বিশেষ কক্ষ রয়েছে। সিঁড়ি বেয়ে সেখানে ওঠা যায়। ধারণা করা হয়, এটি শাসক বা রাজপরিবারের সদস্যদের জন্য পৃথকভাবে ব্যবহৃত হতো। মসজিদের স্থাপত্য পরিকল্পনায় এমন বিশেষ স্থান তৎকালীন রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতারও ইঙ্গিত বহন করে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত, তবু টিকে আছে:
১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে ছোট সোনামসজিদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে এর সংস্কার করা হয়। দীর্ঘ সময়ের ক্ষয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবর্তনের মধ্যেও মসজিদটির মূল স্থাপত্যের বড় অংশ টিকে আছে। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণাধীন একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
এক প্রাঙ্গণে সুলতানি ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ:
ছোট সোনামসজিদের গুরুত্ব শুধু মধ্যযুগের স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রাঙ্গণের কাছেই রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের সমাধি। এখানে শায়িত আছেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এবং মুক্তিযুদ্ধের ৭ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর নাজমুল হক।
ফলে একই স্থানে এসে দর্শনার্থীরা একদিকে দেখতে পান সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন, অন্যদিকে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা বীরদের প্রতি। ইতিহাসের দুই ভিন্ন অধ্যায় যেন এখানে এসে মিলেছে একই প্রাঙ্গণে।
সময়ের সঙ্গে মসজিদের সেই সোনালি চাকচিক্য হারিয়ে গেছে। পাথরের গায়ে জমেছে কালের ছাপ। তবু স্থাপত্যের সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বে বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি ছোট সোনামসজিদ। গৌড়ের বিলুপ্ত নগরসভ্যতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ আজও বলে যায় বাংলার সুলতানি আমলের শিল্প, স্থাপত্য ও কারিগরি দক্ষতার গল্প। আর পাশের দুই বীরের সমাধি মনে করিয়ে দেয়—এই মাটির ইতিহাস শুধু রাজা-সুলতানের নয়; এ ইতিহাস আত্মত্যাগী মানুষেরও।
তাই ছোট সোনামসজিদ কেবল একটি পুরোনো মসজিদ নয়—এটি বাংলার স্থাপত্যঐতিহ্য, গৌড়ের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে একসূত্রে ধারণ করা এক জীবন্ত ইতিহাসের পাঠশালা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









