ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার পোড়াবাড়ি এলাকায় খীরু নদীর ওপর নির্মিত পুরনো ব্রিজটি এখন স্থানীয় লাখো মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সাধারণ মানুষের নিরাপদে যাতায়াতের মাধ্যম হওয়ার কথা থাকলেও এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে। প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, কাঁচের মতো ভাঙছে রক্তমাংসের মানুষের স্বপ্ন। একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় কেউ হারিয়েছেন প্রিয় স্বজনকে, কেউবা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে পথে বসেছেন। জনগণের তীব্র ক্ষোভ, হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের মাঝেও প্রশাসন যেন উদাসীন ও ঠাঁটপড়া বধির। পোড়াবাড়ির এই বেহাল ব্রিজটি ঘিরে প্রশাসনিক চরম গাফিলতি ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার এক নগ্ন চিত্র ফুটে উঠেছে।
শুক্রবার (০২ অক্টোবর) স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে পুরাতন ব্রিজটি সংস্কার এবং নতুন ব্রিজটি চালু করার অনুরোধ জানায়।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন,“আমার ভাইকে হারিয়েছি এই ব্রিজে! কিছুদিন পূর্বে এখানেই একটি ঘোড়াও মারা গিয়েছে। একের পর এক মানুষ পা হারিয়ে আজ পথে বসেছে”—চোখের জল আর বুকে পাথরচাপা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন এক শোকার্ত স্থানীয় বাসিন্দা। খীরু নদীর এই ব্রিজের জরাজীর্ণ দশা যে কত পরিবারের দীপ নিভিয়ে দিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।
স্থানীয় স্কুলের ৫ম শ্রেনীর শিক্ষার্থী আবিদ বলেন, ঐ দিন আমি সাইকেল নিয়ে পড়ে গেছিলাম। এখন ব্রিজটা ঠিক না করলে মুরুব্বিদের চলতে সমস্যা হয়। আমরাও যাইতে পারি না।
স্থানীয় হাবিব মিয়া বলেন,ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত অপর এক বাসিন্দা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “দেশে তিনটি সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কিংবা খীরু নদীর এই ব্রিজের কোনো পরিবর্তন হয়নি! মানুষ হিসেবে আমরা সত্যিই দুঃখিত ও লজ্জিত। আমরা চাই বর্তমান সরকার যেন অনতিবিলম্বে এই জনগুরুত্বপূর্ণ ব্রিজের কাজটা শেষ করে দেয়।”
শুধু সাধারণ পথচারীই নন, চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহল। এলাকার মঠবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক, যিনি নিজেকে বর্তমান সরকারি দলের একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন, তিনি নিজের চরম অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াতের সময় এই ব্রিজের ওপর দিয়েই যেতে হয়। দলীয় পরিচয় যাই থাকুক, প্রতিদিন একদম অসহায়ত্বের মতো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলতে হচ্ছে। এখানে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আমি চাই দ্রুততম সময়ে এই ব্রিজটির জরুরি সংস্কার করা হোক।”
জীবিকার তাগিদে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে এই জরাজীর্ণ ব্রিজে চলাচল করছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ। স্থানীয় ভ্যান চালক রিপন মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “পেটের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন এই ব্রিজে ভ্যান চালাতে হয়। কত লোককে চোখের সামনে এই ব্রিজের কারণে পঙ্গু হয়ে যেতে দেখলাম! কিন্তু আমাদের এই দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই।”
অথচ দৃশ্যপটের উল্টো পিঠে রয়েছে প্রশাসনিক গাফিলতির এক অদ্ভুত নমুনা। নদীর ওপর পাশেই আরেকটি নতুন ব্রিজ নির্মাণ করা সত্ত্বেও তা জনগণের কোনো কাজে আসছে না। ময়মনসিংহ জেলা ও ত্রিশাল উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি এবং সদিচ্ছার অভাবেই নতুন নির্মিত অবকাঠামোটি অব্যবহৃত পড়ে আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী দায়সারা বক্তব্য দিয়ে নিজের দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেন। অন্যদিকে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসনাত জাহান খান বলেন, “এই ব্রিজের পাশেই আরেকটি নতুন ব্রিজ করা হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ আইনি জটিলতার জন্য তা চালু করতে পারছি না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুতই একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইনি জটিলতা নিরসনে আর কত প্রাণ ঝরবে খীরু নদীর এই ব্রিজে? পাশেই নতুন ব্রিজ প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে কেন সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখমুখী হতে হবে? ত্রিশালের পোড়াবাড়ি এলাকার সর্বস্তরের মানুষের এখন একটাই দাবি, অবিলম্বে আইনগত সব বাধা দূর করে নতুন ব্রিজটি যাতায়াতের জন্য উন্মুক্ত করা হোক এবং ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো অংশটির টেকসই সংস্কার করা হোক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









