বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত আত্মবিশ্বাসী, স্বাধীন এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর। কোনো দেশের প্রতি ভয় থেকে নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি বিশেষ অনুরাগ বা আনুকূল্য থেকেও নয়- বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হওয়া উচিত দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ভিত্তিতে। বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সঙ্গে ভূরাজনীতি আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়- আমরা কোন বড় শক্তির পক্ষে? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত- কোন সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো? বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুল উচ্চারিত নীতি- ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে এই নীতির অর্থ কখনোই এমন নয় যে, বাংলাদেশকে সব দেশের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হতে হবে। জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নীরব থাকতে হবে- এমন কথাও নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো, সম্ভব হলে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, মতপার্থক্য হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নিজের অবস্থান নিজেই নির্ধারণ করা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা তাই খুব পরিষ্কার হওয়া উচিত- যেখানে স্বার্থের মিল আছে, সেখানে সহযোগিতা; যেখানে মতপার্থক্য আছে, সেখানে আলোচনা ও দর-কষাকষি; আর কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নয়। অন্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পক্ষ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বর্তমান বিশ্বে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও নিরাপত্তা- সবকিছুর ওপরই এই ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে এই প্রতিযোগিতার মধ্যে অন্ধভাবে কোনো একটি পক্ষ বেছে না নেওয়া। প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়- বাংলাদেশ কার পক্ষে? প্রশ্ন হওয়া উচিত- বাংলাদেশের পক্ষে কী? ভারত বাংলাদেশের নিকটতম বড় প্রতিবেশী।
চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বাজার ও বিনিয়োগের উৎস। জাপান দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও রয়েছে নতুন বাণিজ্য ও যোগাযোগের সুযোগ। এসব সম্পর্ককে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ প্রত্যেকের সঙ্গে তার প্রয়োজন ও স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কোথাও সহযোগিতা করবে, কোথাও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে, কোথাও কঠিন দর-কষাকষি করবে। এটাই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব রূপ। ভারত আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী, সম-মর্যাদার অংশীদার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী, ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তার নানা বিষয় পরস্পরকে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। তাই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের স্বার্থেই প্রয়োজন। তবে সুসম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান। পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশের উচিত নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা।
ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া নয়। একইভাবে, নিজের স্বার্থের কথা বলার অর্থ ভারতের সঙ্গে বৈরিতা তৈরি করাও নয়। নীতিটি হওয়া উচিত সহজ। ভূগোল আমাদের সহযোগিতার প্রয়োজন তৈরি করেছে; সার্বভৌমত্ব আমাদের সম-মর্যাদা দাবি করে। চীনের সহযোগিতা হোক বাংলাদেশের স্বার্থে। চীন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন অংশীদার। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিল্প, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা রয়েছে।
এই সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সেখানে তা অব্যাহত রাখা উচিত। তবে বড় কোনো বিদেশি প্রকল্প গ্রহণের আগে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করা প্রয়োজন। প্রকল্পটি কি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে? অর্থায়নের শর্ত কতটা যুক্তিসংগত? কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হবে? প্রযুক্তি ও দক্ষতা কি দেশে আসবে? প্রকল্পটি কি আমাদের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াবে? ভবিষ্যতে এর আর্থিক ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত হবে? এই প্রশ্নগুলো শুধু চীনের ক্ষেত্রে নয়, সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ কোনো প্রকল্প শুধু এই কারণে গ্রহণ করবে না যে তা একটি শক্তিশালী দেশ দিচ্ছে। আবার অন্য কোনো দেশ অসন্তুষ্ট হতে পারে- এই আশঙ্কায় বাংলাদেশের জন্য উপকারী কোনো প্রকল্প প্রত্যাখ্যানও করা উচিত নয়। উন্নয়ন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত ঢাকায় হবে, বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হোক। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে এসব দেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত এসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করা। তবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অর্থ রাজনৈতিকভাবে সব বিষয়ে একই অবস্থান গ্রহণ করা নয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা সম্ভব, আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থানও বজায় রাখা সম্ভব। এখানেও মূল বিষয় হলো ভারসাম্য। বাংলাদেশ যদি কোনো একটি বাজার, একটি বিনিয়োগকারী দেশ বা একটি অর্থনৈতিক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে তার কূটনৈতিক স্বাধীনতাও সংকুচিত হতে পারে। তাই অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণও পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অবস্থান শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ। বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বন্দর, সমুদ্রপথ, মৎস্য, জ্বালানি, পরিবেশ, দুর্যোগব্যবস্থাপনা এবং সামুদ্রিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের উচিত এই সম্ভাবনাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানো।
ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ানভুক্ত দেশসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌ-যোগাযোগ, দুর্যোগ মোকাবিলা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগে সহযোগিতা করা যেতে পারে। তবে বঙ্গোপসাগর যেন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার আরেকটি ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে, সেটিও বাংলাদেশের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত বঙ্গোপসাগরকে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতার অঞ্চলে পরিণত করা।
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অন্যতম কঠিন পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। এটি সহজ কোনো কূটনৈতিক কাজ নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও ধৈর্যশীল কূটনীতি। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, ভারত, আসিয়ান, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো একটি দেশের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে একাধিক কূটনৈতিক পথ খোলা রাখা বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত একটাই- বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা। বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বহুপক্ষীয় কূটনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যেখানে ছোট ও মাঝারি দেশও বড় শক্তির সঙ্গে একই আন্তর্জাতিক নিয়মের ভিত্তিতে কথা বলার সুযোগ পায়। বাংলাদেশের উচিত এই সুযোগ আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, খাদ্যনিরাপত্তা, উন্নয়ন অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় কোনো একক দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এসব ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তি থেকে আসে না।
বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা, দক্ষ কূটনীতি এবং অন্যদের সঙ্গে ঐকমত্য গড়ে তোলার ক্ষমতাও একটি দেশের প্রভাব বাড়ায়। নিরাপত্তা চাই, সংঘাত নয়। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতাও প্রয়োজন। বাংলাদেশকে তার ভূখণ্ড, সমুদ্রসীমা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে হবে। তবে নিরাপত্তা মানেই সংঘাত নয়। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন, ব্যয়, গুণগত মান, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয় বিবেচনা করা উচিত। কোনো দেশের রাজনৈতিক চাপ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে- এমন পরিস্থিতি কাম্য নয়।
একই সঙ্গে শান্তিরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা কূটনীতিকে শক্তিশালী করবে; কূটনীতির বিকল্প হবে না। পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি আসলে দেশের ভেতরেই। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক শক্তির ওপরও নির্ভর করে। বাংলাদেশ যদি একটি রপ্তানি বাজার, একটি জ্বালানি উৎস, একটি ঋণদাতা, একটি প্রযুক্তি সরবরাহকারী বা একটি বিনিয়োগকারী দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও ধীরে ধীরে কমতে পারে। তাই রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দক্ষ জনশক্তি এবং সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষারও একটি কৌশল। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি কয়েকটি সহজ নীতির ওপর দাঁড়াতে পারে। প্রথমত, জাতীয় স্বার্থ সবার আগে।
আন্তর্জাতিক কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেখতে হবে, সেটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য কী অর্থ বহন করে। দ্বিতীয়ত, বন্ধুত্ব থাকবে, নির্ভরতা নয়। সব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি করা যাবে না। তৃতীয়ত, সহযোগিতা থাকবে, অন্ধ অনুসরণ নয়। যেখানে স্বার্থের মিল আছে, সেখানে সহযোগিতা; যেখানে নেই, সেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান। চতুর্থত, সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক সম্মান। বাংলাদেশ যেমন নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে, তেমনি অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকেও সম্মান করবে।পঞ্চমত, পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে পেশাদার ও ধারাবাহিক।
স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক হিসাবের পরিবর্তে জ্ঞান, তথ্য, কূটনৈতিক দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের সামনে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান কিংবা অন্য কোনো শক্তির মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশকে বেছে নিতে হবে বাংলাদেশকে-ই। এর অর্থ বিশ্বের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং বিশ্বের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত হওয়া- কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, নিজের অগ্রাধিকার ঠিক রেখে। ভারত আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী থাকবে। চীন গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ অংশীদার থাকবে। জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গেও নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এই সব সম্পর্ক একই সঙ্গে থাকা সম্ভব।
কারণ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কোনো একটি দেশের সঙ্গে নয়- বাংলাদেশের নিজের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে। কোনো শক্তিশালী দেশকে ভয় করার প্রয়োজন নেই। আবার কোনো দেশের বিশেষ অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের উচিত- যেখানে সহযোগিতা দেশের জন্য লাভজনক সেখানে হ্যাঁ বলা, জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে না বলা এবং মতপার্থক্য হলে আলোচনার টেবিলে বসা। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- এটি তাই শুধু একটি কূটনৈতিক বাক্য নয়; এটি হতে পারে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি। বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হাতিয়ার হবে না।
বাংলাদেশ এমন একটি অর্থনীতি, কূটনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলবে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অর্থ কোনো একটি শক্তির বিপরীতে অন্য একটি শক্তিকে বেছে নেওয়া নয়; এর অর্থ হলো- বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে সক্ষম হবে। ভয় নয়, পক্ষপাত নয়- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পথনির্দেশক হোক জাতীয় স্বার্থ।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক মেয়র, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, যুক্তরাজ্য


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









