ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না না অনিয়ম, অসঙ্গতি, কারচুপি, জালভোট ও সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হারানো হয়েছে অভিযোগ করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও বায়েজিদ আংশিক) আসনের ১১ দলীয় ঐক্য ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মাওলানা নাছির উদ্দিন মুনির।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও বায়েজিদ আংশিক) আসনে আমি নিরপেক্ষ কেন্দ্রগুলোতে ফলাফলে ফাস্ট হয়েছি। এর মধ্যে পোস্টাল ভোট কেন্দ্র, ১১৭ নং কেন্দ্র ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয় ও ১৪৩ নং কেন্দ্র বায়েজিদ বোস্তামি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়। দেশ ও বিদেশ থেকে এ আসনে সম্মানিত ভোটার যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদান করেছেন, সে পোস্টাল ভোটের ফলাফলে আমি রিক্সা প্রতীকে পেয়েছি ২০৭০ ভোট আর আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১৬৬২ ভোট। ১১৭ নং কেন্দ্র ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম সেনানিবাস বালুচরা, ভোটের ফলাফলে আমি পেয়েছি ২০৩ ভোট, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ১০৬ ভোট এবং ১৪৩ কেন্দ্র বায়েজিদ বোস্তামি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয় ভোটের ফলাফলে আমি পেয়েছি ২৫৮ ভোট। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ১৫২ ভোট। এ ফলাফলে বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব কেন্দ্রগুলো সেনাবাহিনী এলাকা ও নিরপেক্ষ কেন্দ্র ছিল, তাই আমি ফাস্ট হয়েছি। যেসব কেন্দ্রে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সুযোগ ছিল না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ নির্বাচনে নিয়ম, অসঙ্গতি, কারচুপি ও সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং নীল নকশায় রয়েছে- নির্বাচনে অবৈধ প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করা, দলীয় ট্যাগ লাগিয়ে দাঁড়িটুপিওয়ালা নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে আমার প্রতিপক্ষের পছন্দের প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং নিয়োগ করা, কিছু দলীয় প্রিজাইডিংদের নিয়ে ধানের শীষ প্রার্থী নিজে গোপন বৈঠক করা, ভোটের আগের দিন, আগের রাতে ও ভোটের দিন বিএনপির অস্ত্রধারী ক্যাডারদের হুমকি-ধামকি ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ভোটার ও এজেন্টদের কেন্দ্রে আসতে না দেওয়া, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অবৈধ হলেও ধানের শীষ প্রার্থীর ছবি ও প্রতীক সম্বলিত টি-শার্ট পরে ও ব্যাচ গলায় ঝুলিয়ে শত শত ক্যাডারবাহিনী কেন্দ্রে অবস্থান করে ভোটারদের প্রভাবিত করা, সুপরিকল্পিতভাবে ভাসমান ভোটারদের ভোটগুলো ভাড়াটে লোক দিয়ে ব্যাপক জালভোট দেওয়া, বিকাল বেলা বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সে ঢুকানো, অনেক কেন্দ্রে রিক্সা মার্কার এজেন্টদেরকে বের করে দেওয়া, ফ্যাসিস্ট আমলের ভোটের কারিগরদের নিয়ে নতুন ও পুরাতনদের সমন্বয়ে সূক্ষ্ম ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যাপক কারচুপি করা হয়।
নাছির উদ্দিন মুনির বলেন, ‘নির্বাচন পরবর্তী গত দু’দিন ধরে মীর মো. হেলাল উদ্দিনের বাহিনী ফ্যাসিস্ট সময়ের মতো এলাকায় ১১ দলীয় জোট নেতা কর্মী ও আমার নেতা কর্মীদেরকে লাগাতার প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাই তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এমতাবস্থায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত সহায়তা কামনা করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, চট্টগ্রাম-৫ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়ক জামায়াতের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা শুরা ও কর্ম পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি মাওলানা এমদাদ উল্লাহ সোহেল, খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সভাপতি মুফতি শিহাব উদ্দিন, নেজাম ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সহ-সভাপতি মাওলানা মো. ঈসা, এনসিপি হাটহাজারীর যুগ্ম সমন্বয়ক কে আই সাগর, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর সাধারণ সম্পাদক মাওলানা রিজওয়ানুল ওয়াহিদ, নেজাম ইসলাম পার্টি চট্টগ্রাম মহানগর সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আনোয়ার হোসেন রাব্বানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র সাধারণ সম্পাদক মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আল মাদানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চট্টগ্রাম মহানগর প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ জাহিদ হাসান মোহাম্মদ আনাস বিন আব্বাস ও মাওলানা দিদারুল ইসলাম।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাছির উদ্দিন মুনির বলেন, ‘চসিক ২নং ওয়ার্ডের বার্মা কলোনী, ধনিয়াপাড়া, কাশেম কলোনী, সিএনবি কলোনীগুলোসহ সারা চসিক ও সারা উপজেলায় ব্যাপক জালভোট প্রদান করা হয়। আমার প্রতিদন্দ্বী প্রার্থী মীর হেলাল হাটহাজারী আসনের অন্তর্ভুক্ত নাজিরহাট ডিগ্রী কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে চেয়ার ছেড়ে তার স্ত্রী নওসিন আরজান চৌধুরী হেলালকে ঐ কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেন। যার ফলে কলেজের অভ্যন্তরে ও এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রার্থীর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। কিন্তু নাজিরহাট কলেজের অনেক শিক্ষক প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন। যা সম্পূর্ণ বেআইনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে হারানোর জন্য আসনের অনেকগুলো কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। যেমন- ফরহাদাবাদ ৪নং, মির্জাপুর ৮নং, হাটহাজারী পৌরসভা ৬নং, চিকনদন্ডী ১নং, উত্তর মাদার্শা ৪নং, মাহলুমা কেন্দ্রসহ অনেক কেন্দ্র থেকে আমার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়। বিকাল দেড়টার পর ভোটার উপস্থিতি কমে যায় তখন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারদের জিম্মি করে ভাড়াটে লোক দিয়ে ব্যাপক জাল ভোট প্রদান করা হয়। মির্জাপুর ইউনিয়ন ৮নং ভোটকেন্দ্র পশ্চিম সিকদারপাড়া ফোরকানিয়া মাদরাসায় আমার রিক্সা মার্কার কেন্দ্র পরিচালক মো. তারেককে বিএনপির সন্ত্রাসী জব্বারের নেতৃত্বে হামলায় গুরুতর আহত করা হয়েছে, চিকনদন্ডি ইউনিয়নের দরবেশিয়া ৯০নং কেন্দ্রে সন্ত্রাসী সরোয়ার কর্তৃক আমার কর্মী নজরুলকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করা হয় ও ফতেয়াবাদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার বর্তমানে ছাত্রদলের বাপ্পি কর্তৃক মারুফকে, নাঙলমোডা ইউনিয়ন ৪নং ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কর্তৃক আমার এজেন্টদের বেঁধে রেখে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মহড়া দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ব্যালটে ধানের শীষে সীল মারা হয়।’
‘গত ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কর্তৃক আমাকে বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করলেও বায়েজিদ বোস্তামির জনৈক দিদারকে বাদী সাজিয়ে ৭ জানুয়ারি আমার প্রার্থীতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হয়। এ নিয়ে দীর্ঘ ১২ দিন আমাকে কোর্ট-কাচারিতে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এতে করে আমার নির্বাচনি প্রচার- প্রচারণার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। পরে ১৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিন শুনানী করে আমার প্রার্থীতা ফিরিয়ে দেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা দায়রা জর্জ বিশেষ ট্রাইবুনাল আদালতে ব্যানার অপসারণের মিথ্যা ও ভিত্ত্বিহীন অভিযোগে সারাদিন আমাকে কোর্টে বসিয়ে রাখা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুনানীতে তারা প্রমান করতে ব্যর্থ হয়। অথচ তথ্য প্রমান সম্বলিত একই অভিযোগ আমি তার বিরুদ্ধে দিলে কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি।’
‘চট্টগ্রাম-৫ আসনের রিটানিং ও সহকারী রিটানিং অফিসার বরাবর নির্বাচন কমিশনের বিধি মোতাবেক আসনে ২০টি বড় বিলবোর্ড লাগানোর অনুমতি থাকলেও ১৫০টির অধিক রঙিন বিলবোর্ড স্থাপন ও প্রতি ইউনিয়ন এবং সিটি কর্পোরেশন ওয়ার্ডে ১টি করে নির্বাচনি অফিস করার অনুমতি থাকলেও ২ শতাধিক অফিস করা হয়। অভিযোগ করার পরেও তার কোন আইনী প্রতিকার পাওয়া যায়নি।’
‘আপনারা দেখেছেন, নিরপেক্ষ কেন্দ্রগুলোতে পোস্টাল ব্যালট কেন্দ্রসহ কয়েকটি কেন্দ্রের ফলাফলে আমি বেশি ভোট পেয়েছি। ঠিক এভাবে অপর কেন্দ্রগুলোতেও যদি নিরপেক্ষতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকতো তাহলে আমিই বেশি ভোট পেতাম। এখান থেকে বোঝা যায়, আমি পরাজিত হইনি, আমাকে পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে ‘
‘এসব কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ আসনের যে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে তা আমি ঘৃণাভরে প্রত্যাক্ষান করছি। ১১ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের সম্মনিত আমির আমার প্রিয় নেতা মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের ঢাকা-১৩ আসনে কূটকৌশল করে সুনিশ্চিত বিজয় থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। যা জাতির জন্য অত্যান্ত বেদনাদায়ক ও কলংকজনক বলে আমি মনে করি। এসব জুলুম, অনিয়ম ও অত্যচারীদের বিচার আমি আমার আল্লাহকে দিলাম।’
তিনি দেশে বিদেশে সকল ভোটার, ভোটকর্মী, ভোট পরিচালক, ১১ দলীয় ঐক্যজোট শীর্ষ ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









