মাটির দলায় ফুটে উঠছে দেবী দুর্গার রূপ, তুলির আঁচড়ে প্রাণ পাচ্ছে অসুরবিনাশিনীর মুখ। কোথাও চলছে প্রতিমার অবয়ব গড়া, কোথাও শেষ হচ্ছে রং ও সাজসজ্জার কাজ। শরতের আগমনী আবহে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় এখন মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে সাতটি ইউনিয়নের ৫৫টি মণ্ডপে চলছে প্রস্তুতি। প্রতিমা নির্মাণ থেকে শুরু করে মণ্ডপ সাজানো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত আয়োজকেরাও।
দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার পাশাপাশি নির্মাণ করা হচ্ছে ভগবান শিব, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মহিষাসুর ও তাদের বাহনের প্রতিমা। বছরের এই সময়টিতে মৃৎশিল্পীদের হাতের নিপুণতায় মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নেয় পূজার আরাধ্য প্রতিমায়।
মৃৎশিল্পী বাপ্পা বিশ্বাস ও বাবু পাল জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তারা বেশ কিছু প্রতিমা তৈরির কাজ পেয়েছেন। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছেন। তারপরও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরেক মৃৎশিল্পী মনোরঞ্জন পাল বলেন, প্রতিমা তৈরি করতে ধৈর্য ও নিপুণতার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে মুখমণ্ডল তৈরি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে অনেক সময় রাতেও কাজ করতে হয়। পূজা শুরুর আগেই রং-তুলির কাজ শেষ করার প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে পূজামণ্ডপগুলোতে সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ইতোমধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, হিন্দু পরিষদ, হিন্দু মহাজোট ও হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের বাহুবল উপজেলা শাখার নেতারা জানান, এবার উপজেলার ৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে।
বাহুবল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রুহুল আমিন তালুকদার বলেন, প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা, মাইকিং ও নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা রাখা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অপতৎপরতা প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে। পূজার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর, সপ্তমী ১৭ অক্টোবর, অষ্টমী ১৯ অক্টোবর, নবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। মহাষষ্ঠীতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মূল পূজা শুরু হবে। এরপর অঞ্জলি, আরতি ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার শেষে বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের মূল উৎসব।
দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বাঙালির শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতিরও অনন্য প্রকাশ। প্রতিমা নির্মাণ, ঢাকের বাদ্য, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনকে ঘিরে এই উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রাণ সঞ্চার করে। বাহুবলে মৃৎশিল্পীদের নিরলস পরিশ্রম আর আয়োজকদের প্রস্তুতিতে তাই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে শারদীয় উৎসবের প্রতীক্ষিত আবহ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









