পাসপোর্ট হারানোর পর নিয়ম মেনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন সিলেটের বটেশ্বরের রুমন প্রমাণিক। অনলাইনে করা জিডির ট্র্যাকিং নম্বরও ছিল তার কাছে। নতুন পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে গেলেও আবেদন জমা দিতে পারেননি তিনি। কর্মকর্তারা তাকে তিন দিন পর আসতে বলেন।
রুমন প্রমাণিকের মতো আরো কয়েকজন সেবাপ্রার্থী গত বৃহস্পতিবার একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাঁদের বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানার কাছ থেকে হারানো পাসপোর্টের জিডির তথ্য পাওয়ার পর আবেদন গ্রহণ করা হবে। ফলে পাসপোর্ট হারানোর পর নতুন পাসপোর্ট করতে এসে দ্বিতীয় দফায় ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা।
রুমন প্রমাণিক বলেন, ‘‘পাসপোর্ট হারানোর পর জিডি করেছি। নতুন আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রও ছিল। তারপরও আবেদন নেয়নি। কর্তৃপক্ষ তিন দিন পর আসতে বলেছেন।’’
সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, হারানো পাসপোর্টের জিডির তথ্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানাকে পাসপোর্ট অফিসে জানানোর নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, এ নিয়মের কারণে আবেদন জমা দিতে তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দূরের উপজেলা থেকে আসা ব্যক্তিদের আবারও সিলেটে আসতে হচ্ছে।
জৈন্তাপুর থেকে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন মোছা. ফাতেমা বেগম (৪৪)। গত সোমবার কোতোয়ালি থানার ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় তার পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। গত বুধবার জিডি করেন তিনি। জিডির ট্র্যাকিং নম্বরও ছিল। এরপরও বৃহস্পতিবার নতুন পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে পারেননি। কোনো সমাধান না পেয়ে ফিরে যেতে হয় তাকে। মির্জাজাঙ্গাল এলাকার পার্থর পাসপোর্ট হারিয়েছে প্রায় ১৫ দিন আগে। বুধবার নতুন আবেদনের জন্য পাসপোর্ট অফিসে গেলে তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। বৃহস্পতিবার আবারও অফিসে আসেন তিনি।
আবেদন জমা দিতে দীর্ঘ অপেক্ষা
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন কক্ষে সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘ সারি। আঙুলের ছাপ যাচাই থেকে শুরু করে আবেদন জমা দেওয়ার ধাপ পর্যন্ত ছিল ভিড়। বেলা আড়াইটার পরও একই চিত্র দেখা যায়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত অনেককে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কেউ আবেদন জমা দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কারো আবেদনে ধরা পড়েছে ত্রুটি। সমাধানের জন্য এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ছুটছেন তারা। কেউ আবার কাগজপত্র সংশোধন করতে অফিসের বাইরের ফটোকপির দোকানে যাচ্ছেন। এসব ধাপ পেরিয়েও হারানো পাসপোর্টের আবেদনকারীদের কেউ কেউ শুনছেন, ‘তিন দিন পর আসেন।’
শুধু হারানো পাসপোর্টের আবেদন নয়, তথ্য সংশোধন নিয়েও ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। জকিগঞ্জের বাল্লা গ্রামের সাইদ আহমদের জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১২ মার্চ। কিন্তু পাসপোর্টে লেখা হয়েছে ১৩ মার্চ। এক দিনের এ অমিল সংশোধন করতে বেশ কিছুদিন ধরে পাসপোর্ট অফিসে ঘুরছেন তিনি। এখনো সমাধান হয়নি। বিশ্বনাথের নুরজাহান বেগমের আগের আবেদন বাতিল হয়েছে। পরে নতুন করে আবেদন করলেও সেটি গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তার।
নিজের জন্মনিবন্ধন নম্বরে অন্যের পাসপোর্ট
পাসপোর্টের তথ্য নিয়ে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন আলিমের শিক্ষার্থী মো. আবু সাঈদ। নিজের জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে পাসপোর্টের আবেদন করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ওই নম্বর দিয়ে অন্য একজনের নামে আগে থেকেই দুটি পাসপোর্ট করা হয়েছে। আবু সাঈদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইনে আবেদন শেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আঙুলের ছাপ ও ছবি দেওয়ার সময় তাঁকে থামিয়ে দেওয়া হয়। পাসপোর্ট অফিস থেকে তাকে জানানো হয়, তার জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে মো. মাকনুন নামের এক ব্যক্তি দুটি পাসপোর্ট করেছেন। ওই ব্যক্তি বর্তমানে দুবাইয়ে রয়েছেন বলেও তাঁকে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রথমবার এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সালে একই জন্মনিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে দ্বিতীয় পাসপোর্ট করেন মাকনুন। অন্যদিকে আবু সাঈদের জন্মনিবন্ধন নিবন্ধিত হয়েছে ২০০৯ সালের ৪ মার্চ।
আবু সাঈদের বাবা মো. শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ইস্যু করা জন্মনিবন্ধন নম্বর দিয়েই তার ছেলের পাসপোর্টের আবেদন করা হয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর আবেদন জমা দেওয়ার পর আঙুলের ছাপ ও ছবি তুলতে গেলে বিষয়টি ধরা পড়ে।’’
তার অভিযোগ, পাসপোর্ট অফিস থেকে জন্মনিবন্ধন পরিবর্তন বা সংশোধন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘‘জন্মনিবন্ধন আমাদের। ওই নম্বর দিয়ে অন্য একজন কীভাবে দুইবার পাসপোর্ট করলেন, সেটাই বুঝতে পারছি না। এখন নিজের ছেলের পাসপোর্ট করতে গিয়ে আমাদেরই ঘুরতে হচ্ছে।’’
বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস সিলেট
অফিস ঘিরে দালালচক্রের অভিযোগ পাসপোর্ট অফিসের বাইরে রয়েছে বেশ কয়েকটি ফটোকপির দোকান। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, এসব দোকানকে ঘিরে সক্রিয় দালালচক্র। আবেদনে সামান্য ভুল থাকলেও সংশোধনের জন্য তাদের বাইরের দোকানে পাঠানো হয়। সেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।
তাদের দাবি, অফিসের ভেতরেও দালালদের নেটওয়ার্ক রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে দালাল হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, দাবি করেন, জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্যান্য কাগজপত্রে ভুল থাকলে তা সংশোধনের নামে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়। তার অভিযোগ, এসব লেনদেনের বড় অংশ অফিসের ভেতরে চলে যায়। তবে তার এ দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন
সিলেট পাসপোর্ট অফিসের সাবেক পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্তের ঘটনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে কূটনৈতিক পাসপোর্টকে সাধারণ পাসপোর্টে রূপান্তরের অভিযোগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় তাঁকে বরখাস্তও করা হয়। তবে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও পাসপোর্ট অফিসের সেবার মান কতটা পরিবর্তন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সেবাপ্রার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, অভিযান চালানোর সময় মূলত বাইরের দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অফিসের ভেতরে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মোহাম্মদ নুরুল হুদা এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি বৃহস্পতিবার এদিনকে বলেন, ‘‘নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। সীমিত জনবল নিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









