পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুয়েতি আক্তার (২৪)। শুরুতে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন বাড়িতে। সেই টাকায় চলত পরিবারের খরচ। কিন্তু প্রবাসে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন তিনি। দীর্ঘদিন পর পরিবার জানতে পারে, সুয়েতি সৌদির কারাগারে। এরপর কারাগার থেকেই মাসে এক-দুবার পরিবারের সঙ্গে কথা হতো তার।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে বাবার সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় সুয়েতির। বলেছিলেন, আড়াই মাসের মধ্যে দেশে ফিরবেন। কিন্তু এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। এরই মধ্যে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর, ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সুয়েতিকে নিয়ে নতুন করে আতঙ্কে পড়ে পরিবার। ছড়িয়ে পড়া ছবির এক নারীকে নিজেদের মেয়ে বলে দাবি করছেন স্বজনেরা। তবে ওই ঘটনায় সুয়েতি জড়িত কি না, কিংবা তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে কি না—তা নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার।
সুয়েতির বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী চরপাড়া গ্রামে। তিনি দিনমজুর ফজলু মিয়ার পাঁচ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট। পারিবারিক জীবনে দুবার বিয়ে হলেও টেকেনি কোনো সংসার। এরপর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২৩ সালে স্থানীয় লতু মিয়া নামের এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান তিনি। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির কথা বলে তাঁকে পাঠানো হয়। এ জন্য কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবার।
সৌদি আরবে মক্কার আল-মাজাল আল আরাবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন সুয়েতি। পরিবারের ভাষ্য, সেখানে যাওয়ার কয়েক মাস পরই গ্রেপ্তার হন তিনি। তবে দীর্ঘদিন তার আটকের খবর জানতেন না স্বজনেরা। প্রায় এক বছর পর সৌদিতে থাকা এক বান্ধবী ও স্থানীয় দালালের মাধ্যমে তারা বিষয়টি জানতে পারেন। পরে সুয়েতি নিজেই ফোন করে আটকের কথা জানান। এরপর থেকে তার খোঁজখবর মিলত মাঝেমধ্যে।
সুয়েতির বাবা ফজলু মিয়া বলেন, ১৩ অক্টোবর সকালে মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। তখন বলেছিল, আড়াই মাসের মধ্যে দেশে ফিরবে। সে জানিয়েছিল, মারামারির একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তার এক বান্ধবীর কাছে অন্য কথা শুনেছি। এখন ফেসবুকে মৃত্যুদণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ায় আমরা ভয়ে আছি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা জহুরা বেগম বলেন, মেয়েটা বাড়িতে আসবে বলেছিল। এরপর আর কথা হয়নি। আমার মেয়ের কী হয়েছে, আমরা কিছুই জানি না। যদি কোনো অন্যায় করে থাকে, আমাদের সত্যিটা জানানো হোক। আমার মেয়েটাকে জীবিত হোক, মৃত হোক—ফিরিয়ে দিন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই দাবি, মেয়েটাকে আমার কোলে এনে দিন।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সুয়েতি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, ওমরাহ বা হজ করতে নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছড়িয়েছে, সেগুলোর সত্যতা তারা জানেন না। তাদের দাবি, ছড়িয়ে পড়া ছবির সত্যতা যাচাই করে সুয়েতির বর্তমান অবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করা হোক। তিনি জীবিত থাকলে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক। আর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা বা সাজা হয়ে থাকলে পরিবারকে সরকারি মাধ্যমে জানানো হোক।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সুয়েতি আক্তারের বিষয়ে আগে তাদের কাছে তথ্য ছিল না। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছেন। তিনি ওই ঘটনায় জড়িত কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিস্তারিত জানতে তার বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং অনুসন্ধান চলছে।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল আলম বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য খোঁজ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ১৪ অক্টোবর মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের পরিচয় ও ঘটনার বিষয়ে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই দুজনের মধ্যে সুয়েতি আক্তার রয়েছেন কি না, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে কি না—এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার সুয়েতির বাড়িতে গিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড় দেখা যায়। সবার চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা, মনে একটাই প্রশ্ন—সুয়েতি কোথায়, কেমন আছেন? যে মেয়ে পরিবারের সচ্ছলতার আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানার অপেক্ষায় দিন কাটছে পুরো পরিবারের।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









