দুর্গাপূজা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টানা ছুটিতে পর্যটকে মুখর হয়ে উঠেছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। নানা শঙ্কা কাটিয়ে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে বাড়ছে মানুষের ভিড়। পর্যটকদের আগমনে জমজমাট হয়ে উঠেছে শহরের হোটেল, গেস্টহাউস, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হবে। এতে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটন খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় কক্সবাজারে পর্যটকের আগমন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে হোটেলমালিকদের ভাষ্য, গত কয়েক দিনে সেই শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে। ছুটি ঘিরে পর্যটকের উপস্থিতি বেড়েছে, ব্যস্ততা ফিরেছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।
হোটেলমালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার টানা তিন দিনের ছুটিতে অন্তত তিন লাখ পর্যটক কক্সবাজারের সৈকত ভ্রমণ করেছেন। রোববার থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দিনের দুর্গাপূজার ছুটি। এরপর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক ছুটি এবং ২৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপূজার ছুটি মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে টানা ১০ দিনের অবকাশ চলছে। এ কারণে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি ও প্রতিমা বিসর্জন উৎসবকে কেন্দ্র করে পর্যটকের আগমন বেড়েছে। ২১ অক্টোবর বিকেলে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। উৎসবের আগে-পরে তিন দিনে অন্তত চার লাখ মানুষের সমাগম হতে পারে। সব মিলিয়ে ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক আসবেন বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
তিনি জানান, তারকা মানের ২০টির বেশি হোটেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। মাঝারি আকারের হোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষও বুকিং রয়েছে। অবশিষ্ট কক্ষগুলো এক-দুই দিনের মধ্যে বুকিং হয়ে যেতে পারে। এবার কক্ষভাড়ায় কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রশাসনের তদারকি রয়েছে। শহরের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউসে একসঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে।
মঙ্গলবার বিকেলে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পর্যটকদের ভিড়। কেউ সাগরের পানিতে গোসল করছেন, কেউ বালুচরে ছাতা ও চেয়ারে বসে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। অনেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে কিংবা বিচবাইকে সৈকত ঘুরে দেখছেন। পাশের সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টেও ছিল উপচে পড়া ভিড়।
সুগন্ধা পয়েন্টে কথা হয় ঢাকার মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী সোহরাব মিয়ার সঙ্গে। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শনিবার রাতে কক্সবাজার আসেন তিনি। কলাতলীর একটি হোটেলে ওঠার পর সকালে পরিবার নিয়ে সুগন্ধা সৈকতে যান। সেখানে মানুষের ভিড় দেখে তাঁরা লাবণী পয়েন্টে চলে আসেন। ৪৫ বছর বয়সী সোহরাব বলেন, লাবণী পয়েন্টেও হাজারো মানুষের সমাগম দেখেছেন।
হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব জানান, তাঁদের হোটেলের ৮৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত অতিথির চাপ থাকবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, ১০ দিনের ছুটিতে ১০ লাখ পর্যটকের সমাগম হলে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট খাতে ৯০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে পরিবহন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য সেবামূলক খাতেও বেচাকেনা বাড়বে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যটকের আগমন হতে পারে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিমা বিসর্জন উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকদের হয়রানি বন্ধ ও সেবা নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছেন।
এদিকে কক্সবাজার জেলায় এবার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১৫৫টিতে প্রতিমাপূজা এবং ১৬৯টিতে ঘটপূজা হচ্ছে। চকরিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ছয়টি এবং টেকনাফে ছয়টি মণ্ডপ রয়েছে।
বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২১ অক্টোবর সৈকতে অন্তত ৪০০ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়ার কথা। আয়োজকদের আশা, এ উৎসব দেখতে আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ মানুষের সমাগম হবে। এ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল মিঠু বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পূজামণ্ডপে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শান্তিপূর্ণভাবে দেশের সর্ববৃহৎ প্রতিমা বিসর্জন উৎসব আয়োজনের আশা করছেন তাঁরা। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বৈঠক করে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনও প্রস্তুত রয়েছে।
সব মিলিয়ে পূজার ছুটি ও প্রতিমা বিসর্জন উৎসবকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারে পর্যটন মৌসুমের ব্যস্ততা বেড়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা, সেবার মান বজায় রাখা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে এই ভিড় স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









