অশ্রুসিক্ত নয়নে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো, ঢাকের শেষ বাদ্য আর ভক্তদের আবেগঘন প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা।
বুধবার (২১ অক্টোবর) দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যায় সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সুরমা নদী এবং পাগনা, হালি ও ছনুয়ার হাওরে ৫৫টি পূজামণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসবের।
এর আগে সকালে দশমী পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা। পরে দিনভর চলে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি। সন্ধ্যায় বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে ঢাক-ঢোল, কাঁসর ও শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা বিসর্জনস্থলে সমবেত হন। এ সময় ভক্তদের চোখে ছিল বিদায়ের বেদনা, আর কণ্ঠে ছিল আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের প্রত্যাশা।
প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন নদী ও হাওরপাড়ে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ-উচ্ছ্বাস এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান। উৎসবের শেষ দিনে জামালগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সম্প্রীতির চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো।
দুর্গোৎসব চলাকালে উপজেলার সাচনা জগন্নাথ জিউর মন্দির পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর হক শান্ত এবং জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বন্দে আলী।
এ সময় তারা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং উৎসবের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির নেতৃবৃন্দ, উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সমরেন্দ্র আচার্য্য সম্ভু ও সাধারণ সম্পাদক অজিত কুমার রায়, জগন্নাথ জিউর মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি অজয় পাল চৌধুরী ও সহ-সভাপতি অজিত রায়, সাচনাবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাসুক মিয়া, রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সভাপতি কৃপেশ বণিক ও সাধারণ সম্পাদক অনন্ত পাল এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক সজীব বণিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পরিদর্শনকালে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রতিমা বিসর্জন শেষে জামালগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সমরেন্দ্র আচার্য্য সম্ভু ও সাধারণ সম্পাদক অজিত কুমার রায় বলেন, ‘‘এ বছর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ৫৫টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সবার সহযোগিতা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় উৎসবটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধিরও একটি উপলক্ষ।’’
উৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আনসার বাহিনী, পূজামণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবক, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান তারা।
জামালগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বন্দে আলী বলেন, ‘‘এবারের শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। এ সফলতার কৃতিত্ব উপজেলার শান্তিপ্রিয় জনগণের। পূজা চলাকালে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলেছেন, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।’’
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিল্পী রানী মোদক বলেন, ‘‘শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলাবাসীর প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘জামালগঞ্জে যোগদানের পর এখানকার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছিলেন, এবারের দুর্গাপূজায় তার বাস্তব প্রতিফলন দেখেছেন। সবাই মিলেমিশে যেকোনো ধর্মীয় উৎসব সুন্দরভাবে উদযাপন করতে পারেন—জামালগঞ্জের মানুষ তা আবারও প্রমাণ করেছেন।’’
প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। তবে উৎসবের আনন্দ, মানুষের মিলনমেলা এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির স্মৃতি রয়ে গেছে সবার মনে। ভক্তদের প্রত্যাশা, আগামী বছর আবারও আনন্দ, উৎসাহ ও ভক্তির আবহে ফিরে আসবেন দেবী দুর্গা।
জামালগঞ্জে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হওয়ায় স্থানীয়ভাবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহাবস্থান ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা আরও জোরালো হয়েছে। উৎসবের বিদায়লগ্নে সবার কণ্ঠে ছিল একটাই প্রত্যাশা—ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দ ও মানবিক সম্প্রীতি হোক সবার।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









