উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বরিশালের সরকারি কলেজগুলোতে ভর্তি হচ্ছেন হাজারো শিক্ষার্থী। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিত থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আবাসন সংকট। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বরিশালের চারটি সরকারি কলেজে প্রায় ৬৩ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৮০০টি। অর্থাৎ, মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন। বাকি ৯৭ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে আবাসনের বাইরে।
পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে নগরীর বিভিন্ন মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। আবার গ্রামের পক্ষে শহরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় অনেকে দূরবর্তী বাড়ি থেকে যাতায়াত করছেন। কেউ কেউ নিয়মিত ক্লাস না করে শুধু পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম, কমছে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি। বিশেষ করে ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছে।
বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন কলেজ, সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ, সরকারি বরিশাল কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের আবাসন পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
চারটি সরকারি কলেজের মধ্যে সরকারি ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিপর্যস্ত সোনালি আবাসন ব্যবস্থায় আসন রয়েছে ১ হাজার ২০০টি। সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য আসন ১০০টি। সরকারি বরিশাল কলেজে ৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য নেই কোনো আবাসিক হল। অন্যদিকে, সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ১১ হাজার ছাত্রী বিপরীতে আবাসিক আসন রয়েছে ৫০০টি।
সব মিলিয়ে চার কলেজের ৬৩ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬১ হাজার ২০০ জনেরই আবাসিক সুবিধা নেই। দীর্ঘদিনের হলেও এ নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি ব্রজমোহন কলেজে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। ২২টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও ২১টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কার্যক্রম চালু রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য রয়েছে ছয়টি হল। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও আবাসনের চাহিদার তুলনায় এসব হলের আসনসংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল।
কলেজটিতে নতুন বিভাগ চালু হয়েছে, বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। কিন্তু গত ৩৫ বছরে নিয়মিত ছাত্রদের জন্য নতুন কোনো আবাসিক হল নির্মিত হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে নগরীর বিভিন্ন এলাকার মেস ও ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি অংশকে নগরীর বিভিন্ন এলাকার মেস ও ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। শুধু আসনসংকটই নয়, বিদ্যমান হলগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থাও উদ্বেগজনক। অভিযোগ রয়েছে, অনেক হলে ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী থাকছেন। একজনের জন্য নির্ধারিত আসনে দুজনকে থাকতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ, সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।
কলেজটির নিজস্ব সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসনব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে না কেন।
আবাসন সংকটের সবচেয়ে কঠিন চিত্র সরকারি বরিশাল কলেজে। উচ্চমাধ্যমিক, বিএ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের জন্য কোনো আবাসিক হল নেই। ফলে বরিশালের বিভিন্ন উপজেলা ও দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের খরচ বহন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন অনেক শিক্ষার্থী। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবাসন না থাকায় শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির হারও অত্যন্ত কম বলে জানিয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ। তার মতে, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আবাসন সংকট নিরসন জরুরি।
সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজেও আবাসন সংকট প্রকট। উচ্চমাধ্যমিক, বিএ, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। অথচ তাদের জন্য আবাসিক সুবিধা রয়েছে মাত্র ১০০ জন ছাত্রের।
অন্যদিকে, সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় ১১ হাজার ছাত্রী পড়াশোনা করছেন। তাদের জন্য আবাসিক আসন রয়েছে মাত্র ৫০০টি। ফলে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ ছাত্রী আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
নারী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবাসনের বিষয়টি শুধু আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে নয়, নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বিষয়টির সঙ্গেও জড়িত। দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা অনেক ছাত্রীর পক্ষে প্রতিদিন কলেজে যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার নগরীতে মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকার ব্যয় বহন করাও অনেক পরিবারের জন্য দুরূহ। এ অবস্থায় ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পর্যাপ্ত আবাসিক হল নির্মাণকে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তার মতে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও আবাসনব্যবস্থা সে অনুযায়ী সম্প্রসারণ করা হয়নি।
অন্যদিকে, আবাসিক হলের সীমাবদ্ধতা—দুইয়ের মধ্যে পড়ে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি বরিশাল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন বলেন, আবাসনব্যবস্থা না থাকায় কলেজে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার তুলনামূলকভাবে কম। তার মতে, কলেজে ছেলেদের তুলনায় মেয়েশিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। তিনি বলেন, ছাত্রীদের আবাসনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি হল নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে, সরকারি ব্রজমোহন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক কাজী জাহের আহমেদ বলেন, কলেজের বিদ্যমান হলগুলোর অবস্থাও নাজুক। সেখানে শিক্ষার্থীদের মানবেতর পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একজনের নির্ধারিত আসনে দুজন শিক্ষার্থী থাকছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









