শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনে কমরেড ইলাহদাদ খানের অবদান গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। তারা বলেন, ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ইলাহদাদ খান আজীবন মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। তাঁর আদর্শ, মানবিকতা ও দায়বদ্ধতা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রেস ক্লাব যশোর মিলনায়তনে সিপিবির যশোর জেলা কমিটির উদ্যোগে তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর তিনি মারা যান।
স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবি যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবু হাসান। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রভাষক মহিব্বুল্লাহ মহিব। বক্তব্য দেন ছাত্রনেতা রাশেদ খান, মৌমাছি স্কুলের পরিচালক মাসুম বিল্লাহ, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের জেলা সমন্বয়ক তসলিমুর রহমান, বাসদ নেতা শাহজান আলী, জাসদ নেতা আবুল কায়েশ, কৃষক নেতা আবদুর রহিম, ক্ষেতমজুর নেতা আবদুল মজিদ, ইলাহদাদ খানের স্ত্রী অধ্যাপক সুরাইয়া শরীফ, সিপিবি নেতা মফিজুর নান্নু, উদীচী যশোর জেলা সংসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু এবং গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল হোসেনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
বক্তারা বলেন, ইলাহদাদ খান শুধু রাজনৈতিক সংগঠকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সহযাত্রী ও মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো সমাজকর্মী। তাঁর সরলতা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্মরণসভায় আবেগঘন বক্তব্যে অধ্যাপক সুরাইয়া শরীফ স্বামীর জীবনসংগ্রাম ও পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইলাহদাদ খান তাকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করেছিলেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাস্টার্স করার সময় তাদের বড় ছেলে ছোট থাকলেও পরিবারের দায়িত্ব তিনি নিজেই সামলেছেন। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের প্রতিও তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা ছিল।
১৯৪৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোর সদর উপজেলার হামিদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইলাহদাদ খান। তার বাবা মো. গোলাম আকবর খান ও মা আবেদা বানু। যশোর মুসলিম একাডেমিতে বিদ্যালয়জীবন শেষে ১৯৬৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৮ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭১ সালের বিএসসি পরীক্ষায়, যা ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত হয়, প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (ইপিএডিসি) যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয় হন। ১৯৯৩ সালে সিপিবিতে ভাঙনের পর যশোরে দল পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিন দশকের বেশি সময় জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৩ আসনে কাস্তে প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০২৫ সালে সিপিবির যশোর জেলা সম্মেলন পর্যন্ত তিনি জেলা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তার অবদান ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন এবং কলেজটির রসায়ন বিভাগের প্রদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর ২০১৬ সালে যশোরের মৌমাছি স্কুলের হিসাব বিভাগের দায়িত্ব নেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর যশোর জেলা সংসদের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যশোর শাখার সহসভাপতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নারী অধিকার, কৃষক ও ক্ষেতমজুরের অধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশেও ভূমিকা রাখেন।
ব্যক্তিজীবনে ২০২৩ সালে ছোট ছেলে রেশাদ আকবর প্রত্যয়ের অকালমৃত্যুতে গভীর শোকের মুখোমুখি হন তিনি। প্রত্যয় রাশিয়ার কাজান ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন এবং মানবকল্যাণমুখী গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। এই শোকের মধ্যেও ইলাহদাদ খান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন।
যশোরের বেজপাড়ায় ছায়াবীথি সড়কের বাড়িতে ফল ও ফুলের গাছ লাগানো, সংগীতের প্রতি অনুরাগ এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ছিল তার জীবনযাপনের অংশ। ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে দায়িত্ব ও মানুষের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
স্মরণসভা থেকে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সমাজতন্ত্র, সাংস্কৃতিক চেতনা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার আদর্শ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









