চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। গত ছয় মাস ধরে ডেঙ্গু সংক্রমণের দিক থেকে দেশের জেলাগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সীমান্তবর্তী এ জেলা। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু উপসর্গে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। শয্যা সংকটে অনেক রোগীকে মেঝে, সিঁড়ি ও বারান্দায় রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে শহরের প্রতি তিনটি বাড়ির একটিতে মিলেছে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা। সব মিলিয়ে জেলাটিতে ডেঙ্গু এখন বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ, হাসপাতাল সূত্র ও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গুতে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন। তাদের কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়, আবার কেউ উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহীতে নেওয়ার পর মারা যান।
এদিকে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৬ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৮০ জন। এদিন ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি।
নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ, ১০ জন নারী ও ৯ জন শিশু। বর্তমানে ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৩৭ জন পুরুষ, ২৪ জন নারী ও ১৯ জন শিশু। উন্নত চিকিৎসার জন্য চারজনকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ১১১ জন। একই সময়ে বহির্বিভাগে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৪০৩ জনের। উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে ২১৪ জনকে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) জরিপে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার মসজিদপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, নতুন ইসলামপুর, উদয়ন সংঘের মোড় ও চরজোতপ্রতাপ এলাকায় ১৫০টি বাড়িতে পরীক্ষা চালিয়ে ৫৪টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়।
এদিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যার তুলনায় রোগী বেশি থাকায় অনেককে মেঝে কিংবা বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত শয্যা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে সেবা দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যেও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন অর রশীদ বলেন, ‘‘অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে শহরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে মশার প্রজনন ও ডেঙ্গুর লার্ভা বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসন ও মশার বংশবিস্তার রোধে পৌরসভার পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিশেষ টিম গঠন করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব টিম নিয়মিত মশার লার্ভা শনাক্ত ও ধ্বংস করার পাশাপাশি ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটাচ্ছে।’’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী বলেন, ‘‘পৌর এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ মোকাবিলায় আটটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত কাজ করছে। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস, এডিস মশার লার্ভা নিধন এবং জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









