কেউ মোমবাতি জ্বালাবেন বাবার সমাধিতে, কেউ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন মায়ের স্মৃতির প্রতি। কেউ আবার প্রদীপ জ্বালিয়ে স্মরণ করবেন কয়েক প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষদের। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে আত্মীয়তার বন্ধন, শেকড়ের টান আর হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মৃতি ধারণ করে প্রতিবছর এমনই এক আবেগঘন আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে বরিশালের ঐতিহাসিক মহাশ্মশান।
আগামী ৭ নভেম্বর ভূত চতুর্দশীর পুণ্যতিথিতে অনুষ্ঠিত হবে উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্মশান দীপাবলি উৎসব। এদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে হাজারো মোমবাতি ও প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে নগরীর কাউনিয়া এলাকার প্রায় ছয় একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মহাশ্মশান। প্রিয়জনের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও আসবেন অসংখ্য মানুষ। ইতোমধ্যে উৎসবকে ঘিরে শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
মহাশ্মানজুড়ে এখন চলছে সমাধি পরিষ্কার, রং করা, ফুল দিয়ে সাজানো এবং আলোকসজ্জার কাজ। বছরের পর বছর ধরে প্রিয়জনের স্মৃতি আগলে রাখা পরিবারগুলো ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ নিজ উদ্যোগে সমাধি সংস্কার করছেন, আবার কেউ দূর-দূরান্ত থেকে এসে খুঁজে নিচ্ছেন তাঁদের পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন। স্বজনহীন সমাধিগুলোও যেন অবহেলায় পড়ে না থাকে, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে মহাশ্মশান রক্ষা কমিটি।
বরিশাল মহাশ্মশানের ইতিহাস প্রায় দুই শতাব্দীর। ইতিহাসবিদদের তথ্যমতে, ১৮০১ সালের ১ মে তৎকালীন জেলা প্রশাসক জন শ্যোর বাকেরগঞ্জ থেকে জেলার সদর দপ্তর বর্তমান বরিশালে স্থানান্তর করেন। প্রশাসনিক ও নগরকেন্দ্রিক জনবসতি গড়ে ওঠার ধারাবাহিকতায় নতুন বাজার এলাকায় জেলখালসংলগ্ন স্থানে প্রথম মহাশ্মশানের যাত্রা শুরু হয়। সেখানে সমাধির সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরবর্তী সময়ে কাউনিয়া এলাকায় গড়ে ওঠে বর্তমান মহাশ্মশান। ১৮৭৬ সালে বরিশাল পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর মহাশ্মশানটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, নতুন বাজারের আদি শ্মশান ও কাউনিয়ার বর্তমান মহাশ্মশান মিলিয়ে রয়েছে ৭০ হাজারেরও বেশি সমাধি। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি পাকা সমাধি। রয়েছে প্রায় ৮০০টি মঠ, যেগুলোর অনেকটির স্বজন বর্তমানে দেশে নেই। এসব মঠ হলুদ রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীপাবলির রাতে স্বজনহীন এসব সমাধিতেও মোমবাতি প্রজ্বালন করেন কমিটির সদস্যরা।
১৯২৭ সাল থেকে বরিশাল মহাশ্মশানে ধারাবাহিকভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে শ্মশান দীপাবলি। কালীপূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশীর তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে সমাধিতে প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালান। ফুল দিয়ে সাজানো হয় সমাধি। অনেকেই প্রয়াত ব্যক্তির পছন্দের খাবার নিবেদন করেন। পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় চলে তর্পণ, প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার। একসময় বরিশালকেন্দ্রিক এই আয়োজন এখন দেশের বিভিন্ন স্থানেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বরিশাল পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মানিক মুখার্জী কুডু বলেন, “শ্মশান দীপাবলি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার একটি বিশেষ দিন। সারা বছর মানুষ কর্মব্যস্ততায় থাকলেও এই দিনটিতে পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে প্রয়াত স্বজনদের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। অনেকেই দেশের বাইরে থেকেও ছুটে আসেন। প্রতিটি সমাধির সঙ্গে একটি পরিবারের ইতিহাস ও আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
ধর্মীয় ও পারিবারিক আবেগের পাশাপাশি বরিশাল মহাশ্মশান ধারণ করে আছে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সমাজ সংস্কার, নারী জাগরণ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদান রাখা বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাধি ও স্মারক সমাধি রয়েছে এখানে। বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ, নারী নেত্রী মনোরমা বসু মাসীমা, বামপন্থী নেতা হিরণলাল ভট্টাচার্য, কংগ্রেস নেতা শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, নারী নেত্রী রানী ভট্টাচার্যসহ অনেক গুণী মানুষের স্মৃতিচিহ্ন এই মহাশ্মশানে সংরক্ষিত রয়েছে। কবি জীবনানন্দ দাশের পিতা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশের সমাধিও রয়েছে এখানে।
এ ছাড়া অশ্বিনীকুমার দত্তের স্মৃতি সংরক্ষণে ২০১২ সালে ভারতের কেওড়াতলা মহাশ্মশান থেকে মাটি এনে এখানে তাঁর স্মারক সমাধি ও ম্যুরাল স্থাপন করা হয়। আদি শ্মশানে রয়েছে ব্রাহ্ম অনুসারীদের সমাধি। বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী ও সমাজসেবীদের স্মৃতিচিহ্নে সমৃদ্ধ এই মহাশ্মশান বরিশালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণাগার।
বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির সভাপতি অসীম কুমার দাস মুরলী বলেন, “এই মহাশ্মশানের প্রতিটি সমাধি আমাদের কাছে অমূল্য স্মৃতির অংশ। এখানে শুধু সাধারণ মানুষের সমাধিই নয়, বরিশালসহ উপমহাদেশের ইতিহাসে অবদান রাখা অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে। শ্মশান দীপাবলিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন। তাঁদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ করে দিতে সমাধি পরিষ্কার, আলোকসজ্জা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সার্বিক প্রস্তুতির কাজ চলছে।”
দীপাবলির রাতে মহাশ্মশানের চিত্র হয়ে ওঠে অন্য রকম। সারি সারি সমাধিতে জ্বলে ওঠে প্রদীপ ও মোমবাতি। ফুলের সাজে বদলে যায় সমাধিগুলোর চেহারা। কোথাও চলে কীর্তন, কোথাও ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও প্রার্থনা। মহাশ্মশানের কালীমন্দিরেও আয়োজন করা হয় বিশেষ পূজার। স্বজনদের স্মরণে কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন, কেউ চোখের জলে ভেজা স্মৃতির কাছে ফিরে যান। আলোয় আলোকিত হয় এমন সব সমাধিও, যেখানে প্রদীপ জ্বালানোর মতো কোনো স্বজন আজ আর বেঁচে নেই।
ইতিহাসবিদ দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, “বরিশাল মহাশ্মশানকে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি বরিশালের প্রায় দুইশ বছরের নগর ইতিহাস, সামাজিক পরিবর্তন, রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সাক্ষী। এখানে যাঁদের সমাধি রয়েছে, তাঁদের অনেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ফলে এই মহাশ্মশান সংরক্ষণ করা মানে বরিশালের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা।”
মহাশ্মশানের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও রয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অবদান। এখানে দুটি শেডসহ পাকা দাহঘর এবং একটি উন্মুক্ত পাকা দাহস্থল রয়েছে। দাহঘর দুটির নামকরণ করা হয়েছে প্রয়াত ঝর্ণা লাল দাস ও প্রয়াত শ্যাম বণিকের নামে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধির জন্য রয়েছে আলাদা নির্ধারিত স্থান। মহাশ্মশানের প্রবেশপথের একটি তোরণ কারিকর বিড়ির নির্মাণসহায়তায় ‘বিপ্লবী দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ তোরণ’ নামে নির্মিত হয়েছে। অন্য গেটটি নির্মিত হয়েছে নারায়ণ চন্দ্র দে নারুর আর্থিক সহায়তায়। এ ছাড়া কীর্তনঘর, পুকুরের ঘাটলা, ওয়াকওয়ে, সড়ক নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও সৌন্দর্যবর্ধনেও দানশীল ব্যক্তিদের অবদান রয়েছে।
বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে বরিশাল মহাশ্মশান রক্ষা কমিটির মাধ্যমে মহাশ্মশানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের বরিশাল সভাপতি এলবার্ট রিপন বল্লভ বলেন, “শ্মশান দীপাবলি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ। জীবিত অবস্থায় যাঁরা আমাদের জীবনের অংশ ছিলেন, মৃত্যুর পরও তাঁদের আমরা ভুলে যাইনি, এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই প্রকাশ পায়। এখানে ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।”
প্রিয়জনের মৃত্যুতে তৈরি হওয়া শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। সময়ের ব্যবধানে মানুষের উপস্থিতি হারিয়ে যায়, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি থেকে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বরিশাল মহাশ্মশানের শ্মশান দীপাবলি সেই স্মৃতিকে নতুন করে জাগিয়ে তোলারই আয়োজন। আগামী ৭ নভেম্বর হাজারো প্রদীপের আলোয় আবারও আলোকিত হবে দুই শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী এই মহাশ্মশান। সমাধির নীরবতার মধ্যেও জ্বলে উঠবে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর শেকড়ের টান।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









