যে আমের খোসা একসময় ফেলে দেওয়া হতো বর্জ্য হিসেবে, সেই খোসাই এখন হয়ে উঠেছে আয়ের নতুন উৎস। ফেলে দেওয়া আমের খোসা প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হচ্ছে চা, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যাংগো পিল টি’। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তিন বন্ধুর ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যিক পণ্য। প্রতি কেজি চা বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ চার হাজার টাকায়।
ভোলাহাট উপজেলার বজরাটেক গ্রামের মো. মাইনুল ইসলাম, মো. মিঠু ও এ. বান্না মাসুমের সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘সবুজ খাবার’ নামের প্রতিষ্ঠান। সেখানে আমের খোসা থেকে তৈরি হচ্ছে দুই ধরনের চা—‘ম্যাংগো পিল গোল্ড টি’ ও ‘ম্যাংগো পিল ডার্ক টি’। এর মধ্যে গোল্ড টি প্রতি কেজি চার হাজার এবং ডার্ক টি দুই হাজার টাকায় বিক্রি করছেন তাঁরা। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি হচ্ছে এসব পণ্য। উদ্যোক্তাদের দাবি, শুধু এই চা বিক্রি করেই মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন তাঁরা।
উদ্যোক্তাদের এ উদ্যোগের শুরু ২০২২ সালে আমের বাজারে দরপতনের অভিজ্ঞতা থেকে। সে সময় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক কৃষক আম বিক্রি করতে না পেরে গবাদিপশুকে খাওয়াতে বাধ্য হন। এমন পরিস্থিতিতে আমের অপচয় কমিয়ে কীভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা যায়, সেই চিন্তা থেকেই আম নিয়ে কাজ শুরু করেন তিন বন্ধু।
প্রথমে তাঁরা শুকনো আম ও আমের গুঁড়া তৈরি করতেন। কিন্তু এসব পণ্য তৈরির সময় বিপুল পরিমাণ আমের খোসা ফেলে দিতে হতো। পরে সেই খোসা কাজে লাগানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে আমের খোসা থেকে চা তৈরির ধারণা পান তাঁরা। পরীক্ষামূলক উৎপাদনে ক্রেতাদের আগ্রহ দেখে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু করেন।
উদ্যোক্তা মো. মাইনুল ইসলাম বলেন, লেখাপড়া শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজ এলাকায় কিছু করার পরিকল্পনা থেকেই তাঁরা আম নিয়ে কাজ শুরু করেন। আম প্রক্রিয়াজাত করার পর খোসাগুলো ফেলে দিতে হতো। সেগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই চিন্তা থেকেই ম্যাংগো পিল টি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তিন বন্ধুর মধ্যে মো. মাইনুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। মো. মিঠু সরকারি চাকরিজীবী এবং এ. বান্না মাসুম তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের ভাষ্য, নতুন পণ্য তৈরির পাশাপাশি উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তৈরিতেও তাঁরা নিজস্ব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়েছেন।
আম শুকানোর জন্য চীন থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্র আমদানি করতে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হতো। কিন্তু স্থানীয় প্রযুক্তি ও নিজেদের উদ্যোগে প্রায় পাঁচ লাখ টাকায় একই ধরনের যন্ত্র তৈরি করেছেন তাঁরা। এতে ছয় লাখ টাকার বেশি সাশ্রয় হয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।
চা তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁরা জানান, প্রথমে ভালো মানের আম সংগ্রহ করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে খোসা ছাড়ানো হয়। এরপর বিশেষ যন্ত্রে খোসাগুলো চার থেকে পাঁচ দিন শুকানো হয়। সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে ব্লেন্ডার মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে চায়ের উপযোগী করা হয়। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি চা তৈরি করতে প্রায় ১৪ কেজি আমের খোসা প্রয়োজন হয়। এরপর ফুটন্ত গরম পানিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ চা মিশিয়ে তৈরি করা যায় এ পানীয়।
অন্য উদ্যোক্তা এ. বান্না মাসুম বলেন, বিদেশ থেকে দামি যন্ত্রপাতি আমদানি না করে নিজেদের প্রযুক্তিতে কম খরচে যন্ত্র তৈরি করেছেন তাঁরা। তবে অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পরিসরে উৎপাদন ও বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা এবং বাজারসংযোগ পাওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদেশেও পণ্যটি রপ্তানি করতে চান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল আজিজ বলেন, তিনি নিজেও এ চা পান করেছেন। প্রচলিত চায়ের স্বাদের পাশাপাশি এতে আমের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। নতুন স্বাদের কারণে চা-প্রেমীদের মধ্যে এর চাহিদা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ বলেন, তিনি নিয়মিত আমের খোসার চা পান করেন। তাঁর কাছে চায়ের স্বাদ ও ঘ্রাণে আমের আলাদা অনুভূতি পাওয়া যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন বলেন, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের আগে চায়ের পুষ্টিমান, খাদ্যগুণ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করা জরুরি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে নতুন এ পণ্য বাজারে গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। একই সঙ্গে আমচাষি ও উদ্যোক্তাদের জন্য আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পল্লী উন্নয়ন বিভাগের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা মনে করেন, আমের খোসার মতো অব্যবহৃত উপজাত কাজে লাগিয়ে নতুন পণ্য তৈরি কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে উদ্যোগটিকে টেকসই করতে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে এ ধরনের উদ্যোগ বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
ফেলে দেওয়া আমের খোসাকে মূল্যবান পণ্যে রূপান্তরের এ উদ্যোগ শুধু তিন বন্ধুর আত্মকর্মসংস্থানের পথই তৈরি করেনি, বরং আমের উপজাত ব্যবহার করে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে। যথাযথ গবেষণা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









