আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন কংক্রিট আর প্লাস্টিক দখল করে নিচ্ছে গ্রামবাংলার স্যানিটেশন ব্যবস্থা, তখনো গাইবান্ধার এক প্রান্তে নীরবে টিকে আছে পরিবেশবান্ধব এক ঐতিহ্য—মাটির তৈরি ‘পাট’ বা ল্যাট্রিন রিং। যুগের পর যুগ ধরে এই শিল্পের ধারক ও বাহক গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়নের রাধাকৃষ্ণপুর কুমার পাড়ার মৃৎশিল্পীরা।
সরেজমিনে রাধাকৃষ্ণপুর কুমার পাড়ায় গেলে চোখে পড়ে এক ভিন্ন চিত্র। প্রতিটি উঠানজুড়ে কাঁচা মাটির গন্ধ, রোদে শুকোতে দেওয়া বিশালাকার পাট আর চুল্লির পাশে ব্যস্ত কারিগরদের ঘাম ঝরা শ্রম। এখানকার কুমাররা দৈনন্দিন মাটির তৈজসপত্রের পাশাপাশি বিশেষভাবে তৈরি করেন ল্যাট্রিনের সেপটিক ট্যাংকে ব্যবহৃত বড় ও মজবুত মাটির পাট।
এই পাটগুলো শুধু সাশ্রয়ীই নয়, দীর্ঘদিন মাটির নিচে টিকে থাকার ক্ষমতাও রাখে। ফলে আজও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এটি একটি ভরসার নাম। পরিবেশের ক্ষতি না করে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি হওয়ায় অনেকেই একে সিমেন্ট ও প্লাস্টিকের উত্তম বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাধাকৃষ্ণপুর কুমার পাড়ার কয়েকশ পরিবার কয়েক দশক ধরে এই পেশার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছে। কারিগররা জানান, নির্দিষ্ট অনুপাতে বাছাই করা এঁটেল মাটি দিয়ে পাট তৈরি করা হয়। রোদে ভালোভাবে শুকানোর পর বিশেষ চুল্লি বা ‘পায়েন’-এ পোড়ানো হয়, যা পাটকে করে তোলে শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী। মান ও টেকসই হওয়ার কারণে এসব পাট গাইবান্ধা জেলার গণ্ডি পেরিয়ে আশপাশের এলাকাতেও সরবরাহ হচ্ছে।
সংকটে ঐতিহ্যের শেকড় তবে শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্প এখন গভীর সংকটে। মৃৎশিল্পীরা জানান, আগের মতো সহজে মানসম্মত এঁটেল মাটি পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায়, তার দামও সাধারণ কারিগরের নাগালের বাইরে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে খড়ি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি—ফলে উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাজারে সিমেন্টের রিং ও স্ল্যাবের সহজলভ্যতা। দ্রুত নির্মাণ ও প্রচারণার কারণে কংক্রিট পণ্যের দাপটে মাটির পাট ক্রমেই হারাচ্ছে বাজার।
সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় কারিগররা ৯স্থানীয় মৃৎশিল্পী সমিতির প্রতিনিধিরা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা শুধু জীবিকার জন্য নয়, পরিবেশ রক্ষা করেও মানুষের স্যানিটেশন সেবা দিচ্ছি। কিন্তু পুঁজি ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা পেলে এই শিল্পকে আবার ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে প্লাস্টিক ও সিমেন্টের ব্যবহার কমিয়ে মাটির মতো প্রাকৃতিক উপকরণে ফিরে যাওয়া জরুরি। সে ক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণপুরের মাটির পাট হতে পারে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সমাধান।
গ্রামবাংলার এই নিভৃত কারিগরদের হাতে গড়া ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়—সে জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। নচেৎ কালের স্রোতে হারিয়ে যেতে পারে মাটির গন্ধে মোড়া এক জীবন্ত শিল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









