নেত্রকোনার হাওরবেষ্টিত জনপদ খালিয়াজুড়ি—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা, অথচ যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অবহেলায় পিছিয়ে থাকা একটি উপজেলা। ছয়টি ইউনিয়ন, ৫৪টি ওয়ার্ড ও ৬৮টি গ্রাম নিয়ে গঠিত প্রায় ২৯৭.৬৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলায় বসবাস করেন লক্ষাধিক মানুষ। মোট ভোটার প্রায় ৮০ হাজার। ১৯০৬ সালের ১৬ জুন থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯৮৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত যোগাযোগ ব্যবস্থায় এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
বর্ষাকালে নৌকা ও ট্রলারই একমাত্র ভরসা, আর হেমন্তকালে সাইকেল, রিকশা, সিএনজি, অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল। প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাশের মদন উপজেলার উচিতপুর বাজারে যেতে জনপ্রতি খরচ হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। বিশেষ করে বর্ষায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হয় সাধারণ মানুষকে।
এ প্রেক্ষাপটে খালিয়াজুড়ি উপজেলায় একটি উড়াল সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ায় এলাকায় বইছে স্বস্তির হাওয়া। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন কুমার দেব রায় জানান, উচিতপুর থেকে খালিয়াজুড়ি সদর পর্যন্ত উড়াল সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য যাচাই প্রকল্প ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
নেত্রকোনা-৪ আসনের নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর-এর উদ্যোগে এই সেতু বাস্তবায়িত হবে বলে স্থানীয়দের আশা।
উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ স্বাধীন বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া খালিয়াজুড়ির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি উড়াল সেতুই পারে এ জনপদের ভাগ্য বদলাতে।”
বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান তালুকদার কেষ্টের মতে, দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে উড়াল সেতু এখন সময়ের দাবি।
উপজেলা জামায়াতের আমীর ও কৃষ্ণাপুর আলীম মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, “খালিয়াজুড়ি প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। সেতু নির্মাণ হলে পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুগুণে বাড়বে।”
খালিয়াজুড়ি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. গিয়াসউদ্দিন আহমদ জানান, যোগাযোগ উন্নত হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও আমূল পরিবর্তন আসবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী পড়াশোনায় আগ্রহ হারায়। উপজেলা শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক মো. মনজুরুল হক মনে করেন, সেতু নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে থেকে জেলা সদরে পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
কৃষি ও মৎস্য খাতেও আসবে নতুন গতি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বছরে ৮৫ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হলে কৃষকেরা সময়মতো পণ্য বাজারজাত করে বেশি লাভবান হবেন। মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, মাছ আহরণ, সংরক্ষণ ও বিপণনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের সংকট কাটানোর আশাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরেফিন আজিম বলেন, “যোগাযোগের দুর্বলতার কারণে অনেক চিকিৎসক এখানে থাকতে চান না। সেতু হলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় স্থায়িত্ব আসবে এবং জরুরি রোগীদের দ্রুত জেলা বা বিভাগীয় শহরে নেওয়া সম্ভব হবে।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে এ প্রকল্প। খালিয়াজুড়ি থানার ওসি নাসির উদ্দিন জানান, দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা হলে অপরাধ দমন সহজ হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, “যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলেই খালিয়াজুড়ি একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকায় রূপ নিতে পারবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা এই উড়াল সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং খালিয়াজুড়ির দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ঘোচানোর প্রতীক। বাস্তবায়ন হলে হাওরের বুক চিরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে, আর খালিয়াজুড়ি গড়ে উঠবে একটি মডেল উপজেলা হিসেবে
এমনটাই স্বপ্ন দেখছেন এখানকার মানুষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









