বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

মজুরি বৈষম্যের জাঁতাকলে শ্রমজীবী নারীরা

প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

মজুরি বৈষম্যের জাঁতাকলে শ্রমজীবী নারীরা

মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ, পায়ে তপ্ত মাটি কিংবা হাড় কাঁপানো শীত—কোনো কিছুই যেন দমাতে পারে না তাদের। উত্তরাঞ্চলের গ্রামগঞ্জের মেঠোপথ থেকে শুরু করে ফসলের মাঠ কিংবা নির্মাণাধীন প্রকল্প, সবখানেই এখন নারীদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার তাগিদে শ্রমে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কমেনি বঞ্চনা। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও দিন শেষে পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে অনেক কম মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের।

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায় বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। নারী-পুরুষের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সমতার পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে এ দিনটিতে নানা কর্মসূচি থাকলেও, বাস্তবে শ্রমজীবী নারীদের জীবনে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়ছে না।

উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নীলফামারী ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকায় মজুরি বৈষম্য এখন নিত্যদিনের চিত্র। বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার, মাটি কাটা এবং কৃষিকাজে নারীদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো হলেও মজুরির ক্ষেত্রে তারা চরম অবহেলিত।

সরেজমিন দেখা যায়, একজন পুরুষ শ্রমিক সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাটি কাটার কাজ করে মজুরি পাচ্ছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। অথচ একই সময়ে সমান বা তার চেয়ে বেশি বোঝা বহন করেও একজন নারী শ্রমিক পাচ্ছেন মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ, কেবল নারী হওয়ার কারণে দিনপ্রতি মজুরির ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাওটারা গ্রামের নারী শ্রমিক হাসিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা ছেলে মানুষগুলোর সঙ্গে সমান কাজ করি। ওদের মতোই বোঝা টানি। কিন্তু দিন শেষে তারা ৫০০ টাকা পান, আর আমাদের হাতে ধরান মাত্র ৩০০ টাকা। প্রতিবাদ করলে বলার থাকে, ‘করে দেখাও, না হলে যাও’। পেটের দায়ে এই অবিচার মানি নিয়েই কাজ করি।”

একই অভিযোগ গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দিঘলকান্দি চরের সালেহা খাতুনের। তিনি বলেন, “পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই জমিতে মরিচ তোলার কাজ করি। কাজের দিক থেকে আমরা কোনো অংশে কম নই, অথচ তারা ৫০০ টাকা পান, আর আমাদের দেয় ৩০০ টাকা।” আক্ষেপ করে তিনি আরও বলেন, “তাও তো কাজ করে কিছু টাকা পাচ্ছি, এটাই বা কম কী!”

বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অকৃষি খাতে শ্রম দেওয়া নারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই মজুরি বৈষম্যের শিকার।

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস্ সালাম জানান, “উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেশি হওয়ায় নারীরা অনেকটা বাধ্য হয়েই কম মজুরিতে কাজ নেন। মালিকপক্ষ নারীর এই অসহায়ত্ব এবং দর-কষাকষির ক্ষমতার অভাবকে পুঁজি করে মুনাফা লুটছে।”

মজুরি কম দেওয়ার খোঁড়া যুক্তিতে ইটভাটার মালিক আরিফ হোসেন দাবি করেন, “নারীদের শারীরিক সক্ষমতা পুরুষদের চেয়ে কম, তাই তাদের মজুরিও কম।” তবে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। মাটি বহন বা ফসল তোলার মতো কাজে নারীরা পুরুষদের চেয়ে পিছিয়ে নেই, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা কাজের প্রতি বেশি যতœশীল।

রংপুরের সমাজকর্মী কে.এম. আলী সম্রাট বলেন, “নারীর শ্রমে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত না করা শ্রম আইনের লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার পরিপন্থী। উত্তরাঞ্চলের নারীরা মূলত অসংগঠিত খাতে কাজ করেন, তাই তাদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন বা জোরালো কণ্ঠস্বর নেই। প্রশাসনের উচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন ও তদারকি করা।”

উত্তরের জনপদে মঙ্গা হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু শ্রমজীবী নারীদের ভাগ্যের চাকা খুব একটা ঘোরেনি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নয়, নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে ‘সমকাজে সমমজুরি’ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

টিআর

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.