ঝিনাইদহে পেট্রলপাম্পে তেল নিতে এসে বাকবিতণ্ডার জেরে কর্মচারীদের পিটুনিতে এক যুবক নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। শনিবার (৭ মার্চ) দিবাগত গভীর রাতে বিক্ষুব্ধ জনতা শহরের একটি ফিলিং স্টেশনে ভাঙচুর চালিয়েছে এবং কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে। এদিকে ফিলিং স্টেশনে ভাঙচুর এবং টার্মিনালে থাকা বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার প্রতিবাদে ঝিনাইদহ-মাগুরা মহাসড়ক অবরোধ করে পরিবহন শ্রমিকরা।
রোববার (৮ মার্চ) সকালে এ ঘটনা ঘটে। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। যার ফলে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
জানা গেছে, শনিবার রাত ৯টার দিকে শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার ‘তাজ ফিলিং স্টেশনে’ তেল নেয়াকে কেন্দ্র করে কর্মচারীদের সঙ্গে নিরব হোসেন (২৫) নামে এক যুবকের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পাম্প কর্মচারীদের পিটুনিতে নিরব গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মারা যান। নিহত নিরব ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কমিটি’র একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে জানা গেছে। এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা ও আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাত ১টার দিকে বিক্ষুব্ধ জনতা শহরের আরাপপুর এলাকায় অবস্থিত ‘সৃজনী ফিলিং স্টেশনে’ হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। এর কিছুক্ষণ পর রাত ৩টার দিকে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার বাসে আগুন লাগিয়ে দেয় দুষ্কৃতকারীরা। আগুনে রয়েল পরিবহন, জে লাইন ও গোল্ডেন লাইন নামের তিনটি বাসের অধিকাংশ অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সৃজনী পেট্রোল পাম্পের ক্যাশিয়ার আলামিন শেখ জানান, শনিবার মধ্যরাতে অজ্ঞাতপরিচয় ২০-৩০ জনের একটি দল তাদের পাম্পে আকস্মিক হামলা চালিয়ে পাম্পের মেশিন ভাঙচুর করে। এসময় পুলিশ বাধা দিলেও তা অপেক্ষা করে পাম্পের তিনটি মেশিন গুঁড়িয়ে দেয়।
জে লাইনের বাস মালিক জাহাঙ্গির হোসেন জানান, খবর পেয়ে আমি বাড়ি থেকে টার্মিনালে আসি। এসে দেখতে পাই, আমার বাসসহ আরও দুটি বাস দাউ দাউ করে জ্বলছে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন আগুন নেভানোর কাজ করছে।
বাস-মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক রকুনুজ্জামান রানু জানান, এ ধরনের ঘটনাকে আমরা ধিক্কার জানাই। শুনেছি, শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে হারুনর রশীদের তেল পাম্পে তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে একটি ছেলেকে মারধরের জেরে ছেলেটি মারা যায়। সেই একই মালিকের একটি বাস টার্মিনালেও দাঁড়িয়ে ছিল। এ ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা কিনা সে ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে আমরা দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ দেখতে চাই।
ঝিনাইদহ ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, রাত ৩টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। প্রায় আধা ঘণ্টার প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে বাস তিনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে গভীর রাতে বাসগুলো খালি থাকায় কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঝিনাইদহ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার তানভীর হাসান জানান, রাত সাড়ে ৩টার দিকে কে বা কারা ঝিনাইদাহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মানেলে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর একটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তদন্ত শেষে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
সদর থানার ওসি মো. সামসুল আরেফিন গণমাধ্যমকে জানান, কারা আগুন দিয়েছে এখনও পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত হতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট বাস মালিকেরা অভিযোগ দিলে আমরা মামলা নেওয়া হবে। মামলার সূত্র ধরে তদন্ত করা হবে।
ঝিনাইদহ র্যাব-৬ এর কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানায়, ‘শহরের তাজ ফিলিং স্টেশনে রাতে মোটরসাইকেলে তেল নিতে যায় নিরব হোসেন। তখন পাম্প শ্রমিকরা বলে তেল নেই পাম্প বন্ধ আছে। পরে অন্য পাম্পে গিয়ে তেল না পেয়ে তারা ফেরার সময় দেখে ওই পাম্পে বোতলে তেল দেয়া হচ্ছে। তখন তারা শ্রমিকদের বলে আপনারা আমাদের তেল দিলেন না, এখন আবার বিক্রি করছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পাম্প শ্রমিকরা নিরব হোসেনকে মারপিট করে। তাকে হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।’
নিহত নিরব হোসেন (২৫) কালীগঞ্জ উপজেলার বাদুরগাছা গ্রামের আলিমুর বিশ্বাসের ছেলে। সে ঝিনাইদহ শহরের বকুলতলা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে তিনজনকে আটক করেছে র্যাব-৬।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









