বরিশালের হিজলা উপজেলার গৌরবব্দী ইউনিয়নের শাওড়া সৈয়দখালী মৌজায় হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি মহল।
জানা যায়, ৩০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখ থেকে বালু উত্তোলন শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরবি এন্টারপ্রাইজ। এই বালু উত্তোলন শুরু হওয়ায় আশপাশের গ্রাম শংকরপাশা, কাঁকুরিয়া বসবাসকারী লোকজন নদী ভাঙনের আশঙ্কায় রয়েছেন।
তাদের দাবি বালু উত্তোলনের ফলে নদী ভাঙনে ভূমি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন তারা। অপরদিকে মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেরাও আছেন আতঙ্কে। বালু মহাল ঘিরে শত শত বরগেট ড্রেজার নদীতে চলাচল করায় ছেলেদের জাল ছিঁড়ে গেলে মাছ ধরা ব্যাহত হয়। নৌ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে। বালু উত্তোলনের ফলে শত শত মাইলের মধ্যে মাছধরা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।
তাই স্থানীয়দের দাবি-আইনি প্রক্রিয়ার সবকিছু জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক। নদী জেলে পরিবার পরিবেশসহ সবকিছুর স্বার্থে স্বচ্ছতা জরুরি।
সার্ভেয়ার সুমন জানান, তিনি ৩০ এপ্রিল বুধবার সকাল ৯টায় উপস্থিত হয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা পরিমাপ করে দিয়ে এসেছেন। তবে ড্রেজারের সংখ্যা, কাগজপত্র শ্রমিক উত্তোলিত বালুর পরিমাণ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানাতে অস্বীকৃতি জানান। উপস্থিত কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব ইলিয়াস সিকদার বলেন, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই বালুমহাল চালু হয়েছে। তবে তার কাছে টাকা জমা ট্রেজারি চালানোর কপি চাইতে গেলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এই বালু মহাল বন্ধের দাবিতে ৯ মে ২০২৫ তারিখ বিকাল ৩টায় উপজেলার খুন্না বাজারের জেলা পরিষদ ডাকবাংলো সংলগ্ন হিজলা মুলাদি সড়কের দুই পাশে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন হিজলার সাধারণ জনগণ। মানববন্ধন কর্মসূচিতে উপজেলা সর্বস্তরের জনগণ ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে অংশগ্রহণ করেন।
হিজলা নদী ও ভূমি রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক '৫২-এর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক নায়েব আব্দুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা জনপ্রতিনিধিসহ নানা বয়সের কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বক্তারা বলেন, বিভিন্ন সময় প্রমত্ত মেঘনার ভাঙনে হিজলা উপজেলার ফসলি জমি, বসতবাড়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘদিনেও ভাঙন রোধে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
সম্প্রতি উপজেলা ভূখণ্ড রক্ষার জন্য ৬৩০ কোটি টাকার নদী পাক প্রকল্পের কাজ চলমান। সেই মুহূর্তে সাওড়া সৈয়দখালী পয়েন্টে একটি বালু মহাল ইজারা প্রদান করেছে প্রশাসন।
স্থানীয়দের দাবি মেঘনা নদীর এই পয়েন্টে বালু উত্তোলনের ফলে চড়ের ফসলি জমি, বাড়িঘর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারের দেয়া উন্নয়ন প্রকল্প নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধ না করলে কঠোর থেকে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে। আরও কয়েকজন বক্তা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, আমাদের পিতা-মাতার বসত ভিটাটুকু নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন যদি আবার নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পর্যন্ত থাকবে না।
মেমানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন শত শত ড্রেজার দিয়ে কমপক্ষে ১ কোটি ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, এতে অচিরেই বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হিজলা উপজেলার নামটি হারিয়ে যাবে। হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ সীমানায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে নদী ভাঙনের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় সৈয়দ আকবর আলী চৌধুরী মহামান্য হাইকোর্টে বালু উত্তোলন বন্ধে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। শুনানি শেষে মহামান্য আদালত হিজলায় বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু আদালতের আদেশ অমান্য করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালনা করে চলছে।
সৈয়দ আকবর আলী চৌধুরী বলেন, বালু উত্তোলন বন্ধে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে, হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং ১৮৪৪৮/২০২৫। এতে ৩৫নং মৌজা সৈয়দখালী সাওরা মৌজার প্লট নং ৩৮৩২ থেকে ৩৮৮১ পর্যন্ত মেঘনা নদীর ১০০ একর এলাকা ১৪৩২ বাংলা সনের ইজারা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা এই আদেশ মানছে না। তারা প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে। যার ফলে হিজলা মেহেন্দিগঞ্জের একটি বড় অংশে নদী ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
জনাব মাহবুবুর রহমান পিতা মৃত আব্দুল জলিল মাস্টার সাং তেতুলিয়া, মেহেন্দিগঞ্জ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এখানে তিনি উল্লেখ করেন হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে একটি মহল হিজলায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, বালু উত্তোলন বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা নদী ও ভূমি রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে মাননীয় ভূমিমন্ত্রী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না করার কারণে, তাদের লাইসেন্স বাতিল এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করেন। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। সবাইকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে বি আর এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল বাসেদ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দিনের পর দিন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে যাচ্ছে শত শত ড্রেজার দিয়ে।
ইতোমধ্যে কোস্টগার্ড অবৈধ বালু মহালে অভিযান চালিয়ে ৫৬টি ড্রেজার আটক করেন। ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা জব্দ করেন এবং ড্রেজারের ২৬ জনকে আটক করে পুলিশে হস্তান্তর করেন। তবে এতেও থামছে না অবৈধ বালু উত্তোলন।
হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলিয়াস শিকদার জানান, আমরা হাইকোর্টের আদেশ পেয়েছি, হাইকোর্টের আদেশ মেনেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









