পাবনার ঈশ্বরদীতে সবুজ আর তামাটে রঙের পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লিচুর মুকুল। ফাল্গুনের হাওয়ায় কচি পাতার সঙ্গে দোল খাচ্ছে কুশিসহ মুকুলগুলো। গাছে গাছে আনাগোনা বাড়ছে মৌমাছিরও। যদিও এখনো অনেক গাছে মুকুল পুরোপুরি আসেনি। ফাল্গুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত মুকুল আসার সময়। এখন পর্যন্ত লিচুর জন্য অনুকূল আবহাওয়া আছে। ভালো ফলনের আশায় গাছের গোড়া নিড়ানি ও সেচ দেওয়া, ছত্রাকনাশক ছিটানোসহ যত্নআত্তিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাগানমালিক ও ব্যবসায়ীরা।
ঈশ্বরদীতে বোম্বাই, বেদানা, মাদ্রাজি, আঠি , চায়না-থ্রি, চায়না-টু, কাঁঠালি জাতের লিচু আবাদ হয়। সবার আগে মুকুল আসে মাদ্রাজি ও আঠি জাতের লিচুগাছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা বলেন, বর্তমান আবহাওয়া না বেশি ঠান্ডা, না বেশি গরম। এমন আবহাওয়াই লিচুর জন্য প্রয়োজন। গত বছর আবহাওয়া ভালো থাকলেও মুকুল না আসায় ভালো ফলনের মুখ দেখেন'নি তাঁরা। এবারও আবহাওয়া বুঝে সকাল-বিকেল গাছের পরিচর্যা করে যাচ্ছেন।
গত দুই দিন ঈশ্বরদী উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, লিচুগাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করে সেচ দিচ্ছেন চাষিরা। অনেকে গাছের গোড়াসহ পুরো জমি ভিজিয়ে রেখেছেন। মুকুলে স্প্রে করা হচ্ছে ছত্রাকনাশক।
দাশুড়িয়া এলাকার লিচুচাষি মো. আল-আমিন বলেন, মুকুলটা আসার প্রায় দেড় থেকে দুই মাস আগেই সব ধরনের সেচ বন্ধ করতে হয়। মুকুল আসা শুরু হলেই সেচ দিতে হয়। মুকুলটা দৃশ্যমান হলেই ছত্রাকনাশক ও সাড় ছিটাতে হবে। কারণ, এ সময়টাতে পোকার আক্রমণের ভয় থাকে।
তিনি বলেন, কয়েকটি বাগানে তাঁর প্রায় দুইশত'র বেশি গাছ আছে। গত বারের তুলনায় এবার সব কটি বাগানে ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
ঈশ্বরদী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে কমবেশি লিচুর আবাদ আছে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে সলিমপুর, সাহাপুর, পাকশী, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি ও লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়নে মূলত বাণিজ্যিকভাবে লিচুর আবাদ হয়। লিচু চাষের উপযোগী বেলে-দোআঁশ মাটি হওয়ায় এ অঞ্চলে লিচু চাষে দিন দিন কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে।

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, উপজেলায় এ বছর প্রায় ৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ছোটবড় ১১ হাজার ২৭০ টি বাগান আছে। সিংহভাগ জমিতে বোম্বাই জাতের লিচু চাষ হয়। এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চায়না-৩ লিচুর আবাদ রয়েছে। এ ছাড়া বেদানা, চায়না- টু, কাঁঠালি এবং মোজাফফরপুরী জাতের লিচু চাষ হয়।
লক্ষ্মীকুন্ডা এলাকার লিচুচাষি মো. বাচ্চু হোসেনের বাগানে ২৭টি চাইনা-থ্রি জাতের লিচুর গাছ আছে। তিনি বলেন, ‘সব কটিতে মুকুল আসা শুরু হয়েছে। শীতের তীব্রতা না থাকা আর রোদের তাপ না থাকায় ভালো হয়েছে। ফলন নির্ভর করছে মুকুল ঝরে পড়ার ওপরে। তবে এখন সেচ আর কীটনাশকের ওপরে আছি। মুকুল ফেটে গুটি বের না হওয়া পর্যন্ত আবহাওয়া এমন থাকলেই হয়।’
ছলিমপুর এলাকার মো. তুহিন বলেন, ‘ অতিরিক্ত রোদের তীব্রতা এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় লিচুর মুকুল পুড়ে শুকিয়ে যায়, ফুল ঝরে পড়া এবং মুকুল থেকে কচি ফলে রূপান্তরের হার কমে যাওয়া। এ জন্য গাছে পানি দিচ্ছি ও মুকুলে স্প্রে করতেছি। নব্বই গাছের বাগান লিজ নেওয়া। কিছু কিছু গাছে মুকুলের বদলে নতুন পাতা চলে আসছে। তারপরও গাছের যত্নআত্তি করতেছি, দেখি যদি মুকুল আসে। মুকুল তো আসার সময় এখনো আছে। ফাল্গুনীর শেষ সাপ্তাহ পর্যন্ত মুকুল আসবে।’
তিনি আরও জানান, লিচু গাছে মুকুলের সাথে পাতা বের হওয়া সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বা অক্সিন হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণে ঘটে, যা ভালো লক্ষণ নয়। এর ফলে মুকুল ঝরে যেতে পারে বা ফুল আসলেও ফলন কম হতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনে অনুমোদিত হরমোন স্প্রে করে থাকি।
লিচুর ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (উপজেলা কৃষি অফিসার) মোঃ আব্দুল মোমিন বলেন, বর্তমানে লিচু গাছে মুকুল চলে এসেছে। এই সময়ে শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে চারা ও বয়স্ক গাছে। এই সময়ে পোকার আক্রমণ হতে পারে। এটি রোধে নিয়মিত বাগানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে বলেন।
তিনি বলেন, এবার আবহাওয়া এখন পর্যন্ত লিচুর অনুকূলে। সবকিছু ঠিক থাকলে লিচুর রাজধানী খ্যাত ঈশ্বরদী উপজেলায় এবার প্রতি হেক্টরে প্রায় ১১-১৩ মেট্রিক টন বা তার বেশি লিচু উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ছাড়া কৃষকদের লিচুতে কীটনাশক প্রয়োগ না করার অনুরোধ জানান তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









