জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় নদীপথের দ্রুতগামী স্পিড বোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত দুই দিন ধরে চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাট রুটে স্পিড বোট চলাচল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াত করতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের তেমন সংকট না থাকলেও হাতিয়ায় হঠাৎ করেই জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জ্বালানি সরবরাহে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির হস্তক্ষেপ এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণেই স্পিড বোট চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাট পর্যন্ত এই রুটটি হাতিয়ার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শত শত যাত্রী দ্রুত যাতায়াতের জন্য এই স্পিড বোটের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হঠাৎ করে গত দুই দিন ধরে সব স্পিড বোট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের অনেককে বিকল্প ধীরগতির নৌযান ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি লাগার পাশাপাশি দুর্ভোগও বেড়েছে।
যাত্রী ইয়াছিন জানান, জরুরি কাজে প্রায় প্রতিদিনই এই রুটে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু স্পিড বোট বন্ধ থাকায় এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়েও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
আরেক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় নৌযানই মানুষের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। সেখানে যদি জ্বালানি সংকটের কারণে স্পিড বোট বন্ধ থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
স্পিড বোট চালক মনির হোসেন বলেন, ঈদ সামনে থাকলেও স্পিড বোট বন্ধ থাকায় কয়েকদিন ধরে তাদের কোনো আয়-রোজগার নেই। তিনি বলেন, “সারাবছর কষ্ট করে কাজ করি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। কিন্তু এখন আয় বন্ধ থাকায় পরিবারের জন্য বাজার করা তো দূরের কথা, ছেলেমেয়েদের জন্য ঈদের নতুন কাপড়ও কিনতে পারছি না। এতে খুব কষ্ট লাগছে।”
স্পিড বোট হেলপার জিহাদ বলেন, “আমরা অল্প বেতনে কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালাই। এখন জ্বালানি সংকটে স্পিড বোট বন্ধ থাকায় আয়ও বন্ধ হয়ে গেছে। আমার উপার্জনের ওপরই পুরো পরিবার নির্ভর করে। আয় না থাকায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছি।”
স্পিড বোট চালক সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন কালু জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে প্রায় ১০০টি স্পিড বোট বন্ধ রয়েছে। এতে সরাসরি প্রায় তিন শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, “এই গুরুতর সমস্যার প্রতি প্রশাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চালক ও শ্রমিকদের পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়বে।”
এদিকে চেয়ারম্যান ঘাটের জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী এস এম চৌধুরী ট্রেডার্সের মালিক জাফর চৌধুরী দিনু জানান, প্রায় ৮–৯ দিন আগে ডিপো থেকে তেল আনার জন্য তারা গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল পাননি। পরে জানানো হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত অনুমতি ছাড়া তেল দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, “নিয়ম মেনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করে ডিপোতে জমা দিয়েছি। কিন্তু এতকিছুর পরও এখন পর্যন্ত এক ফোঁটা তেলও দেওয়া হয়নি।”
হাতিয়া চেয়ারম্যান ঘাটের আরেক ব্যবসায়ী মদিনা পেট্রোলিয়াম এজেন্সির মালিক মো. জিহাদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তেল সংকটের কারণে তাদের ব্যবসা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য স্পিড বোট ও নৌযানের চালক তেলের জন্য ঘাটে এসে ফিরে যাচ্ছেন। এতে ব্যবসায়ীদের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি বিপাকে পড়ছেন চালক ও শ্রমজীবী মানুষরাও।
হাতিয়ার আফাজিয়ার জ্বালানি তেল ব্যবসায়ী পদ্মা অয়েল কোম্পানির এক ডিলার বলেন, বর্তমানে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্পিড বোট ও অন্যান্য নৌযান বন্ধ থাকায় যাত্রী পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, “তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে ঘাটকেন্দ্রিক শত শত শ্রমিক, চালক ও ব্যবসায়ীরা বেকার হয়ে পড়বেন। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের জোর দাবি, দ্রুত এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে জ্বালানি তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করা হোক।”
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করে স্পিড বোট চলাচল চালু করতে হবে। অন্যথায় দ্বীপবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করে স্পিড বোট চলাচল চালু করতে হবে। অন্যথায় দ্বীপবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী যাত্রী ও শ্রমজীবী মানুষ। তাদের আশা, দ্রুত সমস্যার সমাধান হলে আবারও নদীপথে প্রাণ ফিরে পাবে হাতিয়ার স্পিড বোট চলাচল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









