বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

চিত্রা নদী পুনঃখননের মাটি অপসারণ না করায় যশোরে মানবিক বিপর্যয়

প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০১:০১ পিএম

আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০১:০১ পিএম

চিত্রা নদী পুনঃখননের মাটি অপসারণ না করায় যশোরে মানবিক বিপর্যয়

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলায় চিত্রা নদী পুনঃখননের কাজ স্থানীয়দের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন অনেকের জীবনে চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খননকৃত বিপুল পরিমাণ মাটি দীর্ঘদিন ধরে অপসারণ না করায় নদীতীরবর্তী দুই গ্রামের শতাধিক পরিবার কার্যত মাটির স্তূপের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারের বসতভিটা, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, বাথরুম ও টিউবওয়েল মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে এসব পরিবারের জন্য।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, চিত্রা নদী দীর্ঘদিন ধরে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসছিল এলাকাবাসী। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের জুন মাসে নড়াইলের গড়ের বাজার থেকে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা পর্যন্ত প্রায় ৩৮ কিলোমিটার এলাকায় নদী পুনঃখনন কাজ শুরু হয়। কিন্তু খনন শেষে বিপুল পরিমাণ মাটি নদীর তীরবর্তী লোকালয়ে ফেলে রাখা হয়। সেই মাটি সরানো না হওয়ায় এখন নতুন করে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।

রোববার সকালে সরেজমিনে ধর্মগাতী ও ঘোপদুর্গাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীর ঘেঁষে থাকা অন্তত দেড় শতাধিক পরিবারের বাড়ির চারপাশে বিশাল মাটির স্তূপ জমে রয়েছে। কোথাও রান্নাঘর সম্পূর্ণ মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে, কোথাও গোয়ালঘর কিংবা বাথরুম আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক জায়গায় টিউবওয়েল পর্যন্ত মাটির নিচে ঢেকে গেছে। দূর থেকে অনেক স্থানে বোঝার উপায় নেই যে সেখানে মানুষের বসতি রয়েছে এমন অবস্থায় কার্যত মাটির ঢিবির ভেতর বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রামবাসীরা।

ধর্মগাতী গ্রামের বাসিন্দা বাসন্তী বিশ্বাস বলেন, আমাদের বাথরুম, গোয়ালঘর আর টিউবওয়েল সব মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। পানির ব্যবস্থা নেই, চলাচলের পথ নেই। এমন অবস্থায় এখানে থাকা খুবই কষ্টকর হয়ে গেছে।

একই গ্রামের বাসিন্দা সখি রানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নদীর অপর পাশে প্রভাবশালীরা নদীর জায়গা দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেখানে মাটি ফেলা হয়নি। সাধারণ মানুষের জমিতেই মাটি ফেলে পুরো এলাকা ঢেকে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী খননের সময় কয়েকশ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি বসতবাড়ির চারপাশে বিশাল মাটির ঢিবি তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ির উঠান পর্যন্ত মাটিতে ভরে গেছে। চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশু, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

গ্রামের বাসিন্দা রূপালী বিশ্বাস, রাধা রানী বিশ্বাস, পরিতোষ বিশ্বাস, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস, বিমল সরকার ও বলরাম সরকারসহ অনেকেই জানান, মাটির কারণে অনেক বাড়িতে ঢোকা–বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কোথাও ঘরের দরজার সমান উচ্চতায় মাটি জমে গেছে। বৃষ্টি হলেই সেই মাটি ধসে পড়ে নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত রুনু বেগম বলেন, নদী খনন হলে এলাকার উপকার হবে এটাই আমরা ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন সেই মাটিই আমাদের বাড়ির ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। বর্ষা এলে কীভাবে থাকব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা।

বলরাম সরকার জানান, মাটির স্তূপের কারণে বাথরুম ও টিউবওয়েলের পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে ঘরের বারান্দা পর্যন্ত পানি উঠে গিয়েছিল। এই অবস্থায় বর্ষা এলে কী হবে তা ভেবেই ভয় লাগছে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত মাটি অপসারণ করা না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। পানি জমে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।

এ বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ মুখার্জী বলেন, খননকৃত মাটি বিক্রির জন্য উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১০ মার্চ স্পট নিলামের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে দর ওঠার সময় হট্টগোল সৃষ্টি হওয়ায় নিলাম স্থগিত করতে হয়। ঈদের পর আবারও নিলামের আয়োজন করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, নিলামের মাধ্যমে মাটি বিক্রি হলে দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব হবে। এতে ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ কমবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত মাটি অপসারণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ফলে দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও ক্ষোভ।

বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভুপালী সরকার বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই মাটি বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। জেলার অন্যান্য স্থানের মতো একই দরে মাটি বিক্রি করা হবে এবং সমস্যার সমাধানে প্রশাসন গুরুত্বসহকারে কাজ করছে।

কাওছার আল হাবীব/এদিন

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.