পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে বেড়েছে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ। পদ্মা সেতু চালুর পর এই মহাসড়কটি দেশের অন্যতম ব্যস্ত করিডরে পরিণত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় বর্তমানে এটি একপ্রকার ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রায় ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়ক দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের ঢাকাগামী একমাত্র নির্ভরযোগ্য সড়কপথ। বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা ছাড়াও মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও গোপালগঞ্জের যাত্রীদের জন্য এটি প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। কিন্তু যাত্রীচাপ বাড়লেও সেই অনুপাতে সড়কের উন্নয়ন না হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
মহাসড়কের প্রায় পুরো অংশই এখনো দুই লেনের, যা বর্তমান যানবাহনের চাপের তুলনায় অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট, বাড়ছে যাত্রাসময়। খানাখন্দ, ভাঙাচোরা অংশ এবং সরু লেনের কারণে যানবাহন চলাচল হয়ে পড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় অনেক সময় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। চালকদের অভিযোগ, বারবার সংস্কার করা হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে সড়কের স্থায়িত্ব থাকছে না।
বিশেষ করে বরিশাল-কুয়াকাটা অংশের প্রায় ৩৭ কিলোমিটার এলাকায় ১৭টি বিপজ্জনক বাঁক রয়েছে, যা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। এসব বাঁকে দৃশ্যমানতা কম এবং সড়ক সরু হওয়ায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে সবসময়।
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় সাম্প্রতিক মেরামত কতটা টিকবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
মহাসড়কের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অবৈধ যানবাহনের চলাচল। থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করায় মহাসড়কের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। এতে যেমন সময় বেশি লাগছে, তেমনি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাসযাত্রী মুনিয়া আক্তার বলেন, কুয়াকাটা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে বরিশালের গৌরনদী এলাকায় এলেই ভয় কাজ করে। সড়কের অবস্থা এত খারাপ যে কখন দুর্ঘটনা ঘটে বলা যায় না।
বাসচালক মাসুদ তালুকদার বলেন, এই সড়কে এখন গাড়ি চালানো মানে ঝুঁকি নেওয়া। দুই লেনের কারণে ওভারটেক করাও কঠিন। দ্রুত চার বা ছয় লেনে উন্নীত করা জরুরি।
পিকআপ চালক বিনয় দাস ভাষায়, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত পুরো পথটাই দুর্ভোগে ভরা। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভুগছি, এখন স্থায়ী সমাধান চাই।
চেযরম্যান পরিবহনের চালক মো.সবুজ মোল্লা বলেন, গাড়ি বারবার নষ্ট হচ্ছে, দুর্ঘটনাও ঘটছে। সড়ক ভালো না হলে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব নয়।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ঈদে দুর্ঘটনা কমাতে হলে অবৈধ যান চলাচল বন্ধ করতে হবে এবং পুলিশের তদারকি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এই সড়ক চার বা ছয় লেনে উন্নীত করার বিকল্প নেই।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে আমরা কঠোর নজরদারিতে আছি। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সড়ক সম্প্রসারণ অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
বরিশাল সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে মেরামত ও উন্নয়ন কাজ চলছে। ভুরঘাটা থেকে বরিশাল পর্যন্ত বড় একটি অংশ ভালো আছে। বর্তমানে ১২ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলমান এবং আরও ১২ কিলোমিটার সম্প্রসারণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খণ্ড খণ্ড সংস্কার নয়, ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ককে পূর্ণাঙ্গভাবে চার বা ছয় লেনে উন্নীত করা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সড়কের মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত তদারকি এবং অবৈধ যান চলাচল বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঈদের আগেই ঝুঁকি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন যাত্রী, চালক ও সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় বাড়তি যাত্রীচাপের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক আরও বড় দুর্ঘটনার সাক্ষী হতে পারে, এমন আশঙ্কাই এখন সবার মুখে মুখে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









