পাবনা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু ও জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব গ্রুপের মধ্যে রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে প্রায় ঘন্টাব্যাপী ঈশ্বরদীর রেলগেট থেকে পোস্ট অফিস মোড় পর্যন্ত সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে।
উভয় গ্রুপকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ৮-১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালিয়েছে। সংঘর্ষে ইট ও পাথরের আঘাতে উভয় গ্রুপের অন্তত ৩০-৩৫ নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হয়েছে। উত্তেজিতরা দুটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও শহরের পোস্ট অফিস মোড়স্থ বিএনপির এক পক্ষের কার্যালয়ের চেয়ার ভাংচুর করে। এসময় শহরে যান চলাচলা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
আহতরা হলেন, সদ্য সমাপ্ত হওয়া সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের নিবার্চন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক সাবেক ছাত্রনেতা মাহাবুবুর রহমান পলাশ, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রকি, ছাত্র নেতা নুরে আলম শ্যামল, লিটন, জাকারিয়া, আলমগীর, নাজমুল, নাসির, চঞ্চল, নান্টু, সেন্টু, আশরাফুজ্জামান, কামরুল ইসলামের নাম তাৎক্ষনিকভাবে জানা গেছে। এরা সবাই হাবিব গ্রুপের সমর্থক।
অপরদিকে জাকারিয়া পিন্টু গ্রুপের মধ্যে মনোয়ার, রাজিব, অন্তর, কবির, পলাশ, আক্তার, শরিফ, শিহাব, ফজলু, জুয়েলসহ অন্তত ১০-১২ জন আহত হয়েছেন। এরা সবাই স্বেচ্ছাসেবকদল, যুবদল ও ছাত্রদল কর্মী।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে নুরে আলম শ্যামলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
থানা ও স্থানীয় বিএনপির সূত্রে জানা যায়, ঈদের আগের রাতে হাবিবুর রহমান হাবিবের পক্ষের পৌর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরুল কায়েস সুমন ও নুরে আলম শ্যামলের সঙ্গে চলা যুব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একদলকর্মী ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জাকারিয়া পিন্টু গ্রুপের পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের ৪ নং ওয়ার্ড শাখার আহবায়ক আব্দুল্লাহ রউফ আব্দুলকে গুরুত্বর জখম করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আব্দুলের পক্ষের লোকজন উত্তেজিত হয়ে হামলাকারীদের কয়েকজনের বাড়ি ঘর ভাংচুর করে। এই বিষয়ে জাকারিয়া পিন্টুর ছোট ভাই উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব মেহেদী হাসানের নামে থানায় মামলা দায়ের করেন। একই সঙ্গে হাবিবুর রহমান হাবিবের পক্ষে যুবদলের নেতা পরিচয়ে জোবায়ের হোসেন ওরফে হুব বাপ্পি বিভিন্ন লোকজন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জাকারিয়া পিন্টু, তার ছোট ভাই জুয়েল, সোনা মনি ও মেহেদী হাসানকে সন্ত্রাসী উল্লেখ করে বিষোধগার করে আসছেন।
এর প্রতিবাদে আজ সোমবার সকালে জাকারিয়া পিন্টু গ্রুপ মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে শহরের রেলগেট থেকে একটি বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। মিছিল শেষে তারা ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের বিরুদ্ধে করা অপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
সূত্রগুলো মতে, জাকারিয়া পিন্টুর পক্ষে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল এবং সংবাদ সম্মেলন করায় হাবিবুর রহমান হাবিব গ্রুপের নেতাকর্মীরা পাল্টা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। হাবিবের পক্ষে জোবায়ের হোসেন বাপ্পির সহযোগিতায় বের হওয়া শহরের পোস্ট অফিস মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।
এসময় সংবাদ সম্মেলন শেষ করে মেহেদী হাসান দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রেস ক্লাব থেকে বের হয়ে নিজ এলাকায় ফেরার পথে মধ্যে উভয় গ্রুপ রেলগেট এলাকায় মুখোমুখি হলে উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় ।

ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার জানান, স্থানীয় বিএনপির বিবাদমান দুটি গ্রুপের পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল হওয়ায় সংঘর্ষর এড়াতে হাবিব গ্রুপের মিছিলটিকে থানার সামনের ইউটার্ন ঘুরে পোস্ট অফিস মোড়ে চলে যেতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তারা পুলিশের অনুরোধ উপেক্ষা করে রেলগেটে গেলে পিন্টু গ্রুপের লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। উভয় গ্রুপকে ছত্র ভঙ্গ করতে পুলিশ অন্তত ৮-১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোঁড়া হয়। পরে পিন্টু গ্রুপের লোকজন ধাওয়া করে পোস্ট অফিস মোড়ে থাকা হাবিবুর রহমান হাবিবের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দুটি মোটর সাইকেলে অগ্নি সংযোগসহ ও কার্যালয়ের ভিতরে থাকা চেয়ার ভাঙচুর করে।
সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের নিবার্চন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক সাবেক ছাত্রনেতা মাহাবুবুর রহমান পলাশ অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ পাহারায় জাকারিয়া পিন্টু গ্রুপের মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে তাদের মিছিলে অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে। এতে তিনিসহ দলীয় অন্তত ২০-২৫ নেতাকর্মী বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন। তাদেরকে ঈশ্বরদী, পাবনা ও রাজশাহী চিৎিসসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ ও দলীয় কার্যালয় ভাংচুর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জাকারিয়া পিন্টুর ছোট ভাই ঈশ্বরদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের সাবেক সদস্য সচিব মেহেদী হাসান বলেন, ঈদের আগে চাঁদরাতে তাদের পক্ষের আব্দুল্লাহ রউফ আব্দুলকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেছে হাবিব গ্রুপ। সে এখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এতে আব্দুলের পক্ষে লোকজন হামলাকারীদের কয়েকজনের বাড়ি ভাংচুর করেছেন। অথচ এই ঘটনায় হাবিব গ্রুপের পক্ষ থেকে আমাদের সন্ত্রাসী উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপ্রচার চালানো হচ্ছে। হাবিবের পক্ষে ইমরুল কায়েস সুমন ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জকে ম্যানেজ করে তার অফিস ভাংচুর করার মিথ্যা মামলা দায়ের করিয়েছে। একই সঙ্গে আজ আমাদের বিরুদ্ধে ব্যানারে নানা রকম মিথ্যাচার করে উস্কানিমূলক শ্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে।
মেহেদীর দাবী, ঘটনার সময় ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে রেলগেটে পৌঁছালে হাবিব গ্রুপের লোকজন বিক্ষোভ মিছিল থেকে তাকে লক্ষ্য করে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি বর্ষণ করে। এতে তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে উঠলে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সংঘর্ষে তার পক্ষের অন্তত ১০-১২জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তাদেরকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত চিকিৎসক ডাক্তার তাসনিম তামান্না স্বর্ণা জানান, ইট ও পাথরের আঘাতে আহত হয়ে অন্তত ১৮-২০ জন চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছিলেন। এদের মধ্যে নুরে আলম শ্যামল নামের একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। সংঘর্ষ এড়াতে শহরের বিশেষ বিশেষ স্থানে পুলিশ পাহারায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শহরে সেনাবাহিনী ও র্যাব সদস্যদের টহলে রাখা হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









