ঈদের দীর্ঘ ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ঢল নেমেছে বরিশাল নদীবন্দরে। ঢাকামুখী লঞ্চগুলোতে যাত্রীচাপ এতটাই বেশি যে ডেকে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, নড়াচড়ারও জায়গা নেই। কেবিন অনেক আগেই বুকিং হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ যাত্রীকে ডেক, সিঁড়ি, করিডোর, দ্বিতীয় তলা ও ছাদে অবস্থান নিয়েই ঢাকা যাত্রার প্রস্তুতি নিতে দেখা গেছে।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুরের পর থেকে বরিশাল নদীবন্দরে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় বাড়তে থাকে। জুমার নামাজের পর সেই ভিড় রূপ নেয় জনস্রোতে। থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, মাহিন্দ্রা ও ছোট যানবাহনে করে আসা যাত্রীরা লঞ্চে উঠেই যে যার মতো জায়গা দখল করে বসে পড়েন। অনেকেই চাদর, গামছা বা পত্রিকা বিছিয়ে ডেকে বসে পড়েন, যাতে দাঁড়িয়ে যেতে না হয়।
বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়ার জন্য ১৪টি বিলাসবহুল লঞ্চ প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে এমভি প্রিন্স আওলাদ-১০, কীর্তনখোলা-১০, শুভরাজ-৯, এম খান-৭, সুরভী-৭, সুন্দরবন-১৫, সুন্দরবন-১৬, মানামী, অ্যাডভেঞ্চার-৯, কুয়াকাটা-২, পারাবত-১১, পারাবত-১২, পারাবত-১৮ ও রেডসান-৫ লঞ্চে যাত্রী ওঠানো হয়। বিকেলের মধ্যেই প্রায় সব লঞ্চের ডেক যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে যায়। এছাড়া কয়েকটি লঞ্চ বরিশাল হয়ে ঢাকার পথে যাত্রা করবে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নদীবন্দরের পরিস্থিতি আরও চাপের হয়ে ওঠে। লঞ্চগুলোর ডেক, সিঁড়ি, কেবিনের সামনে, দ্বিতীয় তলার খোলা অংশ এমনকি ছাদেও অসংখ্য যাত্রীকে বসে থাকতে দেখা গেছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে যাত্রা করছেন।
মানামী লঞ্চের সুপারভাইজার মুহাম্মদ বাপ্পী জানান, ঈদের পরে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার যাত্রীচাপ বেশি হবে—এমন ধারণা আগে থেকেই ছিল। তাই প্রায় ১০ দিন আগেই এই সময়ের সব কেবিন বুকিং হয়ে যায়।
অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের সুপারভাইজার নূর খান মাসুদ বলেন, শুক্রবার বিকাল ৪টার মধ্যেই নিচ তলার ডেক যাত্রীতে টইটুম্বুর হয়ে গেছে। আমরা ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রী ওঠাচ্ছি। ধারণক্ষমতা পূর্ণ হলেই লঞ্চ ছাড়বে।
সুরভী লঞ্চের কাউন্টার ম্যানেজার সায়েম জানান, শুক্রবারের সব কেবিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখনও অনেকে কেবিনের জন্য ফোন করছেন, কিন্তু কোনো কেবিন খালি নেই।
সুন্দরবন লঞ্চের কাউন্টার ম্যানেজার শাকিল হাওলাদার বলেন, ঈদের আগে থেকেই শুক্রবার ও শনিবারের কেবিনের জন্য প্রচণ্ড চাপ ছিল। আগে এলে আগে ভিত্তিতে টিকিট দেওয়া হয়েছে। কোনো দালাল বা সিন্ডিকেটকে সুযোগ দেওয়া হয়নি।
সুন্দরবন-১৬ লঞ্চের যাত্রী আব্দুস সোবাহান বলেন, অনেক চেষ্টা করেও একটি সিঙ্গেল কেবিন পাইনি। বাধ্য হয়ে কেবিনের সামনে চাদর বিছিয়ে বসে আছি। নিচ তলার ডেকেও জায়গা পাইনি।
আরেক যাত্রী জানান, ডেকে জায়গা পেতে এক ধরনের যুদ্ধ করতে হয়েছে। দুপুরের পরে এলে জায়গা পাওয়া যেত না, তখন ছাদে করে যেতে হতো।
মানামী লঞ্চের কেবিন যাত্রী তাওহীদ হোসেন শুভ বলেন, ঈদের অনেক আগেই কেবিন বুকিং করে রেখেছিলাম। না হলে পরিবার নিয়ে খুব বিপদে পড়তাম। এখনো কেবিনের বাইরে বের হওয়াও ভিড়ের কারণে কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
এম খান-৭ লঞ্চের যাত্রী সোবাহান মিয়া বলেন, শনিবার অফিস ধরতেই হবে। বাসে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে লঞ্চে এসেছি। এখন দ্বিতীয় তলায় সামনে গামছা পেতে বসে আছি। পরে সুযোগ পেলে কেবিন নেওয়ার চেষ্টা করব।
বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, সন্ধ্যার পরে যাত্রীচাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তবে কোনো লঞ্চকে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বন্দর ছাড়তে দেওয়া হবে না। বিষয়টি আমরা কঠোরভাবে নজরদারি করছি।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীবন্দর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
ঈদ শেষে ঢাকামুখী মানুষের চাপ, বাস সংকট এবং লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী—সব মিলিয়ে বরিশাল নদীবন্দরে তৈরি হয়েছে চাপের পরিস্থিতি। কর্মস্থলে ফেরার তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি নিয়েই গাদাগাদি করে ঢাকার পথে রওনা দিচ্ছেন হাজারো মানুষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









