পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে ভিটে-বাড়ি সব বিক্রি করে দালালদের হাতে প্রত্যেকেই ১২ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিল। কিন্তু গ্রিসে যাওয়ার আগেই লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে সুনামগঞ্জের দশ যুবকের স্বপ্নের ইতি ঘটল। মৃত্যুর খবর জানার পর নিহত দশ এবং নিখোঁজ দুই যুবকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে লাশের অপেক্ষায় স্বজনরা রয়েছেন। তাদের আহাজারিতে দিরাই ও জনগন্নাথপুরে আকাশ- বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়ভাবে পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁরা হলেন: দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫), একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
এছাড়াও দিরাই উপজেলার রাজনগর গ্রামের বাসিন্দা আরজু মিয়ার ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
সুনামগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, “ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১০ জন রয়েছেন বলে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তাঁদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।”
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, দিরাই উপজেলার এক মানবপাচারকারীর সঙ্গে জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকায় চুক্তি করে তারা লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী বড় ও নিরাপদ নৌযানে নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া হয়, যা এই মর্মান্তিক ঘটনার অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, গ্রিসের একটি ক্যাম্পে থাকা নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক এক যুবক সহযোগী শনিবার রাতে মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়। আর যাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের রাখা হয়েছে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে। মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন সুনামগঞ্জের এবং তাঁদের পরিচয় মিলেছে। মূলত খাবার ও পানির সংকটের কারণেই তাঁরা মারা যান বলে তিনি জানিয়েছেন। ওই যুবকের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়।
ওই যুবক আরও জানান, তিনি একইভাবে লিবিয়া থেকে ৬ মার্চ সাগরপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন। পরে তাঁকে ওই ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। ২৭ মার্চ সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ওই ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। গতকাল তিনি আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা সুস্থ আছেন। ওই যুবক বলেন, নৌযানটি পথ হারিয়ে ফেলে। ছয় দিন সাগরে ছিল। এ সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে অনেকে মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগই সুনামগঞ্জের।
অপরদিকে, নিহতের স্বজনরা জানান- স্থানীয় দালাল চক্রের মাধ্যমে তারা লিবিয়া হয়ে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন, এর মধ্যে ফাহিম সৌদি আরব থেকে লিবিয়াতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের কাছে উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি ছাড়াও দক্ষিণ সুদান ও চাদের নাগরিক রয়েছেন। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে দুজনকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হেরাক্লিয়ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, নৌকায় থাকা অনেক মৃতদেহ ইতোমধ্যেই সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সুনামগঞ্জ জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছে।
মাটিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা ইকবাল চৌধুরী রবিবার দুপুরে এদিনকে বলেন, “লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে তাদের গ্রামের তায়েফ আমদ নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা তার কোনো খোঁজখবর না পাওয়ায় চরম উৎকণ্ঠায় আছেন।”
জগন্নাথপুর উপজেলায় চিলাউড়া গ্রামের নিহত নাঈমের বাবা দোলন মিয়া এদিনকে জানান, “নিহত নাঈমের ২ বছরের একটি শিশু সন্তান রয়েছে। এই শিশুটি এখন এতিম হয়ে গেল। এসব মৃত্যুর পেছনে দালালদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।”
তিনি আরও জানান, “মৃত্যুর খবর পাওয়ার তিন মাস আগে থেকেই দালালদের সাথে যোগাযোগ ছিল। তারা প্রত্যেক সপ্তাহে ‘গেইম’ নেওয়ার কথা জানাত। পরে কোনো গেইম নেওয়া হয়নি। অবশেষে তিন মাস পর শেষ গেইম নিয়ে নিল নাঈম। তবে মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে নাঈমের সাথে কথা হয় তাঁদের।”
নাঈম সেই সময় পরিবারকে জানায়, “দালালরা সময়মতো খাবার দিচ্ছেনা। সাগরপাড়ি দেওয়ার পথে নাঈমসহ অন্যান্যদের এক প্যাকেট বিস্কুট ও এক বোতল পানি দেওয়া হয়।” দোলন মিয়ার অভিযোগ, পানি ও খাদ্যের অভাবে নাঈমসহ অন্যদের মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল শনিবার (২৮ মার্চ) বার্তা সংস্থা এএফপি তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, লিবিয়া থেকে ইউরোপ যাওয়ার পথে গ্রিসের উপকূলে একটি রাবারের নৌকায় অন্তত ২২ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ ও সুদানের নাগরিক। ওই নৌকা থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
এদিকে, শুক্রবার (২৭ মার্চ) গ্রিসের কোস্টগার্ড জানিয়েছে, একই নৌকা থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি নাগরিক।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









