দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার শুশুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গাছ ও গাছের ডালপালা চুরি করে গোপনে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাকি বেগমের বিরুদ্ধে।
সোমবার (৩০ মার্চ) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এলাকাবাসী সম্মতিতে মো. জিয়াউর রহমান এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের অজুহাতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিভিন্ন গাছের ডালপালা কাটা হয়। কিন্তু সরকারি বিধি অনুযায়ী সেগুলো সংরক্ষণ বা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করার পরিবর্তে প্রধান শিক্ষক কোনো অনুমোদন ছাড়াই গোপনে একটি হোটেলে বিক্রি করে দেন। বিক্রি করা কাঠের পরিমাণ আনুমানিক ২০ মণ; যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিলাম প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এভাবে সরকারি সম্পদ বিক্রি করা স্পষ্টতই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। এ ছাড়া অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয়ের গাছের ডালপালা অনিয়মিতভাবে কেটে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসী আরও জানান, গাছ ও ডালপালা কাটায় বাধা দিতে গেলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সরকারদলীয় লোক পরিচয় দিয়ে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্কের পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের টেংনার মোড় এলাকার একটি হোটেলে ওই গাছ ও ডালপালার কিছু অংশ এখনও মজুত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে এবং দ্রুত তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযোগকারী মো. জিয়াউর রহমান বলেন, “আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আত্মসাৎকৃত গাছ ও ডালপালা বিক্রির অর্থ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
অভিযোগ অস্বীকার করে শুশুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাকি বেগম বলেন, বিদ্যালয়ের কোনো গাছ বা গাছের ডালপালা বিক্রি করা হয়নি। কয়েক বছর আগে কাটা কিছু ডালপালা তিনি নিজের খরচে একটি কক্ষে সংরক্ষণ করে রেখেছেন, যা তাঁর সহকর্মীরাও দেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই কক্ষের ভেতরে এসব গাছ রাখার বিষয়টি চলে আসছে। হঠাৎ করে বিষয়টিকে বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে প্রচার করা হচ্ছে, যা তাঁর জন্য অপমানজনক। তিনি আরও দাবি করেন, সরকারি দলের লোক হওয়ায় হয়তো বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এবং প্রকৃত বিদ্যালয়-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনজুরুল হক মিয়া বলেন, বিদ্যালয়ে পিকনিক বা কোনো অনুষ্ঠান হলে গাছের ডালপালা রান্নার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কখনোই গাছ বা ডালপালা বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়নি এবং বিদ্যালয়ের কোনো সম্পদ বিক্রির অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তালুকদার জানান, বিষয়টি তাঁদের নজরে রয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ের সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একটি বিদ্যালয় কেবল শিক্ষাদানের স্থানই নয়; এটি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসনের ধারণা গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই প্রতিষ্ঠানে যদি অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে তারা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, প্রশাসনের তদন্তে কী উঠে আসে এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়—সেদিকেই তাকিয়ে আছেন এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









