বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

মিটার চার্জ প্রত্যাহার, বছরে কোটি টাকা সাশ্রয়

প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম

মিটার চার্জ প্রত্যাহার, বছরে কোটি টাকা সাশ্রয়

দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং ন্যায্যতার প্রশ্নে সরব হওয়া লাখো বিদ্যুৎ গ্রাহকের দাবি অবশেষে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। যশোরসহ সারা বাংলাদেশে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের মাসিক ভাড়া বা ‘মিটার চার্জ’ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নব নির্বাচিত বর্তমান সরকার। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি গ্রাহকবান্ধব নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘মিটার ভাড়া’ নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ জমে উঠেছিল, এই ঘোষণার মাধ্যমে তার একটি কার্যকর সমাধান আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার (২৯ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থাকে আরও গ্রহণযোগ্য ও জনবান্ধব করতে সরকার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছে এবং গ্রাহকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ কমাতে এই মাসিক চার্জ সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগকে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং এটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০৭ সালে প্রিপেইড মিটার চালু করা হয়, যা ২০০৮ সালের অক্টোবর থেকে বিপিডিসি’র অধীনে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে যশোর ও অন্যান্য অঞ্চলে, বিশেষ করে ২০১৬-২০২১ সময়কালে ব্যাপক হারে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়।

এই ব্যবস্থায় গ্রাহকরা আগাম টাকা রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, ফলে বিল বকেয়া থাকার সুযোগ কমে যায় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি প্রতি মাসে ‘মিটার ভাড়া’ নামে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়ার প্রথা শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল। কারণ, অনেক গ্রাহকের যুক্তি ছিল মিটার স্থাপনের সময় বা নির্দিষ্ট কিস্তির মাধ্যমে তারা ইতোমধ্যে মিটারের মূল্য পরিশোধ করেছেন, এরপরও কেন প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হবে, সেটি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

এই প্রশ্ন ধীরে ধীরে একটি বড় সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় সভা-সমাবেশ এবং গণমাধ্যমে বারবার বিষয়টি উঠে আসে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির গ্রাহকদের জন্য এই চার্জ একটি অপ্রয়োজনীয় আর্থিক বোঝা হিসেবে দেখা দিত। মাসে ৪০ টাকা ছোট মনে হলেও বছরে ৪৮০ টাকা, আর থ্রি-ফেজের ক্ষেত্রে বছরে ৩ হাজার টাকার বেশি এই হিসাব অনেকের জন্যই কষ্টকর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

যশোর অঞ্চলে এই অসন্তোষ আরও স্পষ্ট ছিল। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) এর আওতায় জেলায় বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার ৯৮৯টি প্রিপেইড মিটার চালু রয়েছে। এর মধ্যে ওজোপাডিকো-১ এর আওতায় ২৭ হাজার ৩২৯টি এবং ওজোপাডিকো-২ এর আওতায় ২৯ হাজার ৬৬০টি মিটার রয়েছে। সিঙ্গেল ফেজ ও থ্রি-ফেজ মিলিয়ে এই বিপুল সংখ্যক গ্রাহক দীর্ঘদিন ধরে মাসিক চার্জ দিয়ে আসছিলেন।

তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গেল ফেজ মিটার রয়েছে মোট ৫৩ হাজার ৯৯৪টি এবং থ্রি-ফেজ মিটার রয়েছে ২ হাজার ৯৯৫টি। এসব মিটারের জন্য যথাক্রমে ৪০ টাকা ও ২৫০ টাকা করে মাসিক চার্জ নেওয়া হতো। সেই হিসাবে প্রতি মাসে সিঙ্গেল ফেজ মিটার থেকেই আদায় হতো ২১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ মিটার থেকে ৭ লাখ ৪৮ হাজার ৭৫০ টাকা।

সব মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৯ লাখ ৮ হাজার ৫১০ টাকা গ্রাহকদের কাছ থেকে কেটে নেওয়া হতো। এই চার্জ প্রত্যাহারের ফলে এখন এই পুরো অর্থ গ্রাহকদের সাশ্রয় হবে। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯১ হাজার ১২০ টাকা, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্থনৈতিক স্বস্তি।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে যশোরের গ্রাহকদের মধ্যে স্বস্তি ও সন্তোষের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

শহরের কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হুদা বলেন, আমরা তো মিটার কিনেই ব্যবহার করছি। তারপরও প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হয় এটা কখনোই যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। সরকার এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমরা খুশি। এতে অন্তত অপ্রয়োজনীয় একটি খরচ কমবে।

পালবাড়ী এলাকার গৃহিণী জোবাইদা বেগম বলেন, প্রতি মাসে বিলের সঙ্গে ৪০ টাকা কেটে নেওয়া হতো। ছোট অঙ্ক মনে হলেও বছরে এটা অনেক টাকা হয়ে যায়। এখন এই চার্জ না থাকলে কিছুটা স্বস্তি পাবো। 

শহরের জামে মসজিদ লেনের ব্যবসায়ী আকিব হাসান বলেন, থ্রি-ফেজ মিটার ব্যবহার করি, প্রতি মাসে ২৫০ টাকা দিতে হতো। এই অতিরিক্ত চার্জ খুবই বিরক্তিকর ছিল। সরকারের সিদ্ধান্ত দেরিতে হলেও সঠিক হয়েছে।

তরুণ প্রজন্মও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী মায়শা আক্তার বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। অবশেষে সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে, এটা ভালো লাগার বিষয়।

তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশেষ করে, এটি কবে থেকে কার্যকর হবে এবং আগে কাটা চার্জের কোনো সমন্বয় বা ফেরত দেওয়া হবে কি না এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট নির্দেশনা আসেনি। অনেক গ্রাহকই এ বিষয়ে সরকারের পরবর্তী ঘোষণার অপেক্ষায় আছেন।

ওজোপাডিকোর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন বলেন, মন্ত্রী মহোদয় প্রিপেইড মিটারের চার্জ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এখনো আমাদের কাছে কোনো অফিসিয়াল চিঠি আসেনি। চিঠি পাওয়ার পর আমরা বিস্তারিত জানাতে পারবো।

তিনি আরও জানান, প্রিপেইড মিটারগুলোতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকায় এটি বন্ধ করতে কারিগরি আপডেট প্রয়োজন হবে। সফটওয়্যার ও সিস্টেম আপডেটের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।

উল্লেখ্য, যশোরে ওজোপাডিকোর আওতায় প্রায় ৫৭ হাজার প্রিপেইড মিটার থাকলেও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় এখনো কোনো প্রিপেইড মিটার চালু হয়নি। ফলে এই সিদ্ধান্ত মূলত শহর ও নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার গ্রাহকদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

ফারদিন/যশোর/সাজ্জাদ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.