ঝালকাঠিসহ দক্ষিণাঞ্চলের খালবিল, নদীর তীর ও গ্রামীণ সড়কের পাশে একসময় চোখে পড়তো দৃষ্টি নন্দন ঢোলকলমি বা বনকলমি আঞ্চলিক ভাষায় বেড়ালতা। সেই ঢোলকলমির সবুজ ঝাড় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। গুজব, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং কুসংস্কারে সেই সহজলভ্য দেশজ উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে।
ঢোলকলমি গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ। দ্রুত বর্ধনশীল এই গাছ অল্পদিনেই ঘনঝাড়ে পরিণত হয়। গাঢ় সবুজপাতা আর পাঁচ পাপড়ির হালকা বেগুনি বা গোলাপি ফানেল আকৃতির ফুলের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তোলে। একটি মঞ্জুরিতে চার থেকে আটটি ফুল ফোটে। সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলে মধুরটানে কালভোমরের আনাগোনা আর বাতাসে দুলতে থাকা ডালে বসে কীটপতঙ্গভুক পাখির বিচরণ সবমিলিয়ে গ্রামীণ জীববৈচিত্র্যর প্রাণ ছিল এ ঢোলকলমি।
নদীর তীরে, খালের পাড়ে কিংবা গ্রামীণ সড়কের পাশে জন্ম, মাটিকে আকড়ে ধরে রেখে ভাঙ্গন কিংবা মাটির ক্ষয়রোধে বেশ ভূমিকা রাখত। পাশাপাশি বসতভিটায় সবজি ক্ষেতের বেড়া হিসেবেও এর ব্যাপক ব্যবহার ছিল।
তবে নব্বইয়ের দশকে এক অদ্ভুত গুজব!! ঢোলকলমি গাছে থাকা একধরনের পোকাকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে আতংক। এর কামড়ে কিংবা স্পর্শে নাকি মৃত্যু অবধারিত। এই গুজবে গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে ভীতি। সাধারণ মানুষ গণহারে ঢোলকলমি গাছ ধ্বংস করা শুরু করে। যদিও পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞরা টেলিভিশনে সরাসরি পোকাটি হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে প্রমাণ করেন এটি মোটেও প্রাণঘাতী নয়। এরপর আতংক কমলেও ততদিনে ঢোলকলমির বিস্তর মারাত্মকভাবে কমে যায়।
রাজাপুর উপজেলার কৃষক সুলতান আহমদ, মামুন, আবুল হোসেন জানান, ঢোলকলমি খুবই উপকারী গাছ। এ গাছের পাতা তিতা হওয়ায় গরু-ছাগলের খায় না, ফলে বেড়া হিসেবে এবং এক সময় জ্বালানি কাজে ব্যবহার হতো। খাল কিংবা নদীর পাড়ে ভাঙ্গন রোধে এটি বেশ উপকারী।
পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং বিশ্লেষকরা মনে করেন, গুজব নির্ভর সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনাহীন নিধন এবং গ্রামজীবনের দ্রুত পরিবর্তন সব মিলিয়ে দেশজ অনেক উদ্ভিদের মতো ঢোলকলমিও হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ পরিবেশ সংরক্ষণ, মাটির ক্ষয়রোধ ও জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে এমন উদ্ভিদের গুরুত্ব নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
প্রকৃতি ও প্রাণের স্বার্থে প্রাকৃতিক বেড়া হিসেবে পরিচিত ঢোলকলমির সংরক্ষণ ও পূনরায় বিস্তারে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এখনই জরুরি। নয়তো গ্রাম বাংলার চেনা সবুজের আরেকটি অধ্যায় হারিয়ে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









